Skip to content

ঈদে চাই নতুন জুতো!! (সত্যিই কি??)

জুলাই 4, 2013

লিখেছেনঃ নায়লা নুজহাত


ড্রেসি ডেল বলে একটা দোকান আছে ঢাকা শহরে, অন্য কোথাও আছে কিনা আমি ঠিক জানিনা! একবার পরিবারের একজন আমাকে বললেন সেখান থেকে আমার যা মনে চায় কিনতে, তিনি তার বিল দিয়ে দিবেন। আমি গেলাম। দোকানের বাইরে দেখলাম খুব সুন্দর কিছু কাপড় রাখা। একটা কামিজের দাম দেখলাম ১১০০০ টাকা! সাথে আমার বান্ধবী ছিল। বলল এ দোকানে ৪০০০ দিয়ে সম্ভবত শুরু সবকিছু। দোকানে আর ঢুকিনি! দামী শাড়ি, দামী কামিজ এসব সবসময়ই আমার কাছে অর্থহীন ঠেকে– অনেকেই একদিনের বেশী সেসব পরেনও না। কেবল মানুষকে একটা দিন দেখানোর জন্য এত আয়োজন করাটা কেমন যেন অপচয় মনে হয়।

গতবছরের কোরবানির ঈদে, হজ্জে যাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলাতে হয় মেয়েকে নিয়ে যাব নাকি রেখে যাব এসব চিন্তায়। যেহেতু হজ্জে যাব ভেবেছিলাম, কোরবানি এদেশে দেয়ার কথা ভাবিনি। তবু ঈদের দুদিন আগে একজন বললেন গরুতে এক ভাগ খালি আছে, দিতে চাইলে দিতে পারি। এবার ধরেই নিলাম যে ইনশাআল্লাহ দিচ্ছি, তাই আর বাজার ঠেকে গরু বা খাসীর গোশত কিনিনি! ঈদের আগেরদিন, যখন কিনা আর বাজারে যাওয়াও সম্ভব না, জানা গেল যে গরুর ভাগটা পাওয়া যাচ্ছে না! আমার এখনো মনে আছে ঈদের দিন দুপুরে আমি রান্না না করে চুপচাপ বসে ছিলাম। জানি এ নিয়ে এত কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। তবু মনে হচ্ছিল সব বাসায় আজ যেমনই হোক মাংস রান্না হবে, শুধু আমার বাসা ছাড়া। এমন সময় একজন ফোন দিলেন তিনি তাঁর ভাগের থেকে কিছু মাংস দিয়ে যাবেন। তিনি সেটা দিয়ে গেলেন, আমি রাঁধলাম এবং তখন মনে হল যে হ্যাঁ, আজকে ঈদ।

এটা নিয়ে আমরা অনেক হাসাহাসি করেছি পরে! হয়ত আমার আচরণটা ছেলেমানুষিই ছিল। কিন্তু আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ যে সেদিন আমার ঘরে মাংস ছিল না। নাহলে কোনদিন বুঝতামও না ঈদের আনন্দ মানুষের সাথে ভাগ করে নেয়ার অর্থ কী!

বহু বছর আগের কথা। পরেরদিন রোজার ঈদ। আমি শুনছিলাম আমাদের এক আত্মীয়ার কথা। স্বামীকে বলছিলেন, “সবাই কালকে নতুন কাপড় পরবে, আমার ছেলে দুটার জন্য কিছু একটা নিয়ে এসো, নাহলে ওদের যে মন ছোট হয়ে যাবে!” কিছুক্ষণ পর স্বামী বেরিয়ে গেলেন বাসা থেকে, পৃথিবী ভরা ক্লান্তি তাঁর দুই চোখে নিয়ে! আমি জানতাম ভদ্রলোক গলা পর্যন্ত ঋণে ডুবে আছেন! কিন্তু না, দোকানে গিয়েছেন, কিনেও এনেছেন। জানি না কিভাবে। সমাজের চাপিয়ে দেয়া নতুন কাপড়ের নিয়ম রক্ষার্থে আরেকবার কারুর থেকে টাকা ধার করেছিলেন কিনা তাও জানিনা। শুধু জানি, বাচ্চাদের আনন্দ দেখে তাঁর মুখে এক পলকের জন্য যেই হাসি এসেছিলো, তাও মিলিয়ে গিয়েছিলো দুর্ভাবনার যন্ত্রণায়!

——————————-

আমি কেনাকাটার বিরুদ্ধে কিছু বলছি না। দেখাই যাচ্ছে আমি নিজেও যে কেনাকাটা করি না তা নয়! কারুর সামর্থ্য আছে, সে কাপড় কিনবে– এই মস্ত হালাল কাজটাকে হারামও ঘোষণা করছি না। আমার কেবল সবার কাছে এটুকুই অনুরোধ– একটু ভেবে দেখবেন কি, আমরা কোন পথে চলেছি?

ঘরে আলমারি ভর্তি কাপড় থাকলেও কয়েক হাজার টাকা খরচ করে ঈদের কাপড় কিনতেই হবে, প্রতি বছর! একবার না, দুই দুই বার! এটা কি কোনও নিয়মে পরিণত হতে পারে??! আগে, আমাদের মা খালাদের যুগে ঈদের কাপড় মানে শুনেছি নানীর বানানো জামা। হয়ত বছরে ওই দুইবারই নতুন দুইটা জামা দেয়া হত সন্তানদের। আমরা তো সেটাও করি না। সারাটা বছরই সবাই কাপড় কিনছি, জুতা কিনছি। তার ওপর ঈদে আবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত নতুন কিছু লাগবে– যদি বলেন ঈদ সামাজিক অনুষ্ঠান তো আমি আর কিছু বলবো না। কিন্তু যদি বলেন ঈদ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মুসলিম হিসেবে যা বলারই কথা, তাহলে বলুন, এই কি আমাদের শিক্ষা দেয় ইসলাম? রমজান মাসের অর্ধেক মার্কেটে পড়ে থাকা? হাজার হাজার টাকার জিনিস কেনা?

আজকে আপনি যখন ৫০০০ টাকার শাড়ি পরে আপনার আত্মীয়দের দেখাবেন, ওর মাঝে আপনারই খুব ঘনিষ্ঠ কেউ হয়ত আছে যে নতুন কাপড় দূরে থাকুক,ভাল কোনও খাবারও তেমন রাঁধতে পাননি? তাঁর সন্তানেরা যখন দেখবে ঈদে সবাই নতুন কাপড় কেনে, সেটাই নিয়ম, তারাও কি তাদের “অক্ষম” বাবার কাছে এই দাবী নিয়েই যাবে না, যে আমাদেরও চাই?? আমাদের কাজের প্রভাব সমাজের ওপর কিভাবে পড়ে তা দেখার দায় কি নেই আমাদের? এই যে সবার দেখা দেখি একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গিয়েছে যে ঈদে সবকিছু নতুন হওয়া চাই– চাকরির এই বাজারে প্রতিটা স্বামী/বাবার পক্ষে কি সম্ভব এভাবে দেয়া? এর প্রভাব আমরা দেখতে পাই ঈদের আগে মানুষের ঘুষ খাওয়ার বহর দেখে! হারাম উপার্জন করে হলেও সমাজের কাছে মাথা উঁচু রাখতেই হবে! রহমতের মাসে ঘুষ খাওয়ার বিনিময়ে হলেও!

যত টাকা আমরা নিজেদের জন্য খরচ করি, একটু সচেতন হলে আমরা তা অপরের জন্য জমাতে পারি! হ্যাঁ, সবার দুঃখ ঘোচানো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু আল্লাহর কাছে তো বলতে পারবো, যে রব আমার, আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি?? নিজে ৫০০০ টাকার কাপড় পরে আমার আত্মীয় না খেয়ে আছেন বলে তাঁর হাতে ৫০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে আমার সাধ্য এটুকুই তা বুঝাতে যাইনি? চলুন একটা ঈদে আমরা এসব খরচগুলো না করে আমাদের গরীব আত্মীয় স্বজন সবাইকে নিয়ে ঈদ করি? আসুন এই জঘন্য প্রথাটা আমরা একটা বার ভেঙ্গে দেখাই যে না, সামর্থ্য থাকুক আর না থাকুক, ঈদে নতুন কাপড় লাগবেই লাগবে এ আর চলতে দিবো না??

প্রতিবার একটা কথা বলি। আমরাই সমাজ। সমাজ আমি, সমাজ আপনি, সমাজ তুমি! সমাজ আমরা!!! আজকে কোনোকিছু যদি বদলাতে হয়, তবে সবার আগে বদলাতে হবে নিজেদের!

একটা সত্যি ঘটনা বলি।

সিলেটের নিয়ম হল, মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে রমজান মাসে ইফতার পাঠাতে হবে। একটা দিন, ভ্যান ভর্তি করে খাবার যায় মেয়ের বাড়িতে। পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে নিয়ে যেন খাওয়া যায় সেভাবে। অনেককে টাকা ধার করেও এ প্রথা বজায় রাখতে দেখেছি। এ নিয়ে আবার তুলনাও হয়, এই বউ এর বাপের বাড়ি থেকে ভালো ইফতার এলো, না সেই বউয়ের! একবার আমার বাবা আমার ফুপুকে বললেন, সামনের বছর থেকে তোমার জন্য আর এভাবে ইফতার যাবে না। আমার ফুপু এসব বোঝেন, তিনিও আপত্তি করলেন না। পরের বছর তিনি সকলের সমালোচনা শুনলেন। তারপরের বছর তাঁর সম্পর্কে জা হন একজন মহিলার বাপের বাড়ি থেকে ইফতার এলো না! সমালোচনার ঝড় উঠলো! তিনি আমার ফুপুকে দেখিয়ে বললেন, “তাঁর ভাইয়ের সামর্থ্য থাকার পরও যদি তাঁরা ইফতার না পাঠাতে পারেন, তাহলে আমার গরীব বাপ ধার করে কেন পাঠাবেন বছরের পর বছর??” ব্যস, ক্ষয় ধরল নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় একটি প্রথার! হয়ত তা একটা ছোট এলাকার গণ্ডি পেরোতে পারেনি। তবু একটা বাড়ির পাঁচটা বউয়ের ক্ষেত্রে হলেও, ক্ষয় তো ধরেছে! চাইলে কেউ উদাহরণ টেনে দেখাতে পারছে!

আসুন আমরা নিজেদের বদলাই। কেবল একটা ঈদ যদি আমরা নতুন কাপড় ছাড়া করি, যার যার সবচেয়ে ভালো পোশাক আলমারি থেকে নামিয়ে নিয়ে পরি, খুব কি ক্ষতি হবে? সেই টাকাটা যদি আমরা আমাদের গরীব আত্মীয় স্বজনের কাছে দেই, যেন রমজান মাসটা তাঁরা একটু সুন্দর করে কাটাতে পারেন, ঈদের দিনটা একটু ভালো খেতে পারেন, খুব কি ক্ষতি হবে? একটা বার চেষ্টা করেই দেখি চলুন! আমাদের বাচ্চারাও দিতে শিখবে। আমরাও শিখব কত সামান্যতে আনন্দ পাওয়া যায়! আর নতুন কাপড় চাইই চাই–এই প্রথাটা দেখবেন কেমন নড়বড়ে হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!

রমজান মাস, ইদ–এগুলো যেমন তেমন অনুষ্ঠান না যে আসলো আর চলে গেল! নিজের আত্মা দিয়ে, হৃদয় দিয়ে, নিজেকে দিয়ে এই দিনগুলোর প্রতিটা মুহূর্ত পার করার কথা! আল্লাহ যেন আমাদের তৌফিক দেন, যাতে দুনিয়ার চাওয়া পাওয়ার পেছনে এই মাসটা চলে না যায়! সমাজ আমাকে কী চোখে দেখছে– এই ভাবতে ভাবতে রমজান মাসটা কেটে না যায়! পুরো মাসটা যেন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির মাঝে কাটাতে পারি! আর ঈদের দিনটায় আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার যেন হয় কিয়ামতের দিন জানতে পারা যে আল্লাহ আমাদের মাসব্যাপী সংযমে সন্তুষ্ট! আমীন!

আল্লাহ কুরআনে আমাদের বলেছেনঃ

And spend in the Cause of Allah and do not throw yourselves into destruction (by not spending your wealth in the Cause of Allah), and do good. Truly, Allah loves Al-Muhsinun (the good-doers). (2:195)

আর

Who is he that will lend to Allah a goodly loan so that He may multiply it to him many times? And it is Allah that decreases or increases (your provisions), and unto Him you shall return. (2:245)

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের অনেক দিয়েছেন। আসুন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির মাঝে রহমতের মাসটি পার করার চেষ্টা করি!

Advertisements
One Comment leave one →
  1. M Hasan A permalink
    অগাষ্ট 14, 2013 2:34 পুর্বাহ্ন

    Wonderful, mashaAllah

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: