Skip to content

স্কিল ডেভেলপমেন্ট সিরিজ: টাইম ম্যানেজমেন্ট

অক্টোবর 15, 2012


লিখেছেনঃ নূসরাত রহমান

গত সপ্তাহে দু’টো সেমিনারে গিয়েছিলাম, একটা ক্যারিয়ার বিষয়ক, অপরটা স্কিল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক। ক্যারিয়ার সেমিনারে এক কোম্পানির রিক্রুটার এসছেন, তিনি কোম্পানির ভাল মন্দের পাশাপাশি রিক্রুটাররা কীভাবে চিন্তা করে সেটা নিয়েও কথাবার্তা বললেন, যেমন, একে দেখে কনফিডেন্ট মনে হয় কি না, সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে কি না, বসার কিছু ভঙ্গি আছে রক্ষণাত্মক, সেগুলো এড়িয়ে চলে কি না। তারপর কোম্পানি সম্পর্কে যথেষ্ট জানে কি না। এসব ত জানা কথা, কিন্তু তার বাইরেও বেশ কিছু কথা বললেন, যেটা খুব ভাল লেগেছে আমার।

উনি বললেন, এখন থেকেই বিভিন্ন কাজে নিজের দক্ষতাগুলি যাচাই করার চেষ্টা কর। এত ক্লাশ, কাজের ভিড়ে বাসার জন্য সময় বের করা – এগুলো নির্দেশ করে তুমি দায়িত্বগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পার। আর ভারসাম্য রাখার পূর্বশর্ত নিজের সময়টাকে গুছিয়ে ব্যবহার করতে পারা। তুমি যদি ছাত্রজীবনে ভাল করে টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখ, তাহলে চাকুরিতেও অনেক রকমের চাপ সহ্য করে কাজ করতে পারবে – সেটা নিশ্চিত হয়ে বলা যায়।

বেশ ভাল লাগল কথাটা। এর দুইদিন পরেই ছিল একঘন্টার একটা টাইম ম্যানেজমেন্ট সেমিনার। আমি উন্মুখ হয়ে ছিলাম যাওয়ার জন্য, কারণ আমার কাজের প্রায়োরিটিগুলি এত ছড়ানো ছিটানো, ঠিকঠাকমত সময় অ্যালোকেট করতে না পারলে সমস্যা।

উনারা প্রথমেই যেটা করতে দিলেন, জানতে চাইলেন, সারাদিনে আমরা কী কী কাজ করি। কীসে কীসে বেশির ভাগ সময় চলে যায়। আমার জন্য ছিল ব্লগিং, নেটওয়ার্কিং এসব। অন্য কয়েকজন বলল ইউটিউবে ভিডিও দেখে দেখে। একজনের বাচ্চাকাচ্চা সামলাতে। ত সব মিলিয়ে কয়েকটা মোটা দাগে কাজ বের হল, যেগুলো দিনের অনেকটা সময় খেয়ে নেয়।

তারপর উনারা জিজ্ঞাসা করলেন, সময় বাঁচাতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছি এখন পর্যন্ত। আমি ঘুমের সময় কমিয়ে দিয়েছিলাম কয়েকবার, কাজ হয়নি। এক মেয়ে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক রুটিন ঠিক করে রেখে ফলো করার চেষ্টা করেছে, কিছুদিন পর বাদ দিয়েছে।

তখন একটা এক্সারসাইজ করতে দিল, আমাদের দৈনিক কোন কাজে কত ঘন্টা সময় যায়। যেমন ঘুম দৈনিক কত ঘন্টা, গোসল, সাজুগুজু কত ঘন্টা, রান্না ও খাওয়া ও ক্লিনিং কত ঘন্টা, কাজ কত ঘন্টা, ব্রাউজিং, সোশ্যালাইজিং ইত্যাদি ইত্যাদি.. সব কিছু মিলিয়ে মোট কত ঘন্টা হয় সেটা যোগ করে সপ্তাহের মোট যে ১৬৮ ঘন্টা – তার থেকে বিয়োগ করতে হবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে হিসাব কষে দেখানো, কে কত ঘন্টা সময় পায় পড়াশুনা করার জন্য বা যে কাজ করা দরকার তার জন্য।

হিসাব করার পর বেশ মজার উপাত্ত বের হয়ে আসল। অনেকগুলো ছোট বাচ্চা নিয়ে বেসামাল ভদ্রমহিলাটির হাতে আছে ৩৬ ঘন্টা। তিনি হতভম্ব! তাঁর ধারণা ছিল তাঁর কোন সময়ই নেই। আরেক মেয়ে, যে প্রায় সারাটা সময় অলস ইউটিউব দেখে কাটায়, তার পড়াশুনার জন্য পুরো সপ্তাহে সময় আছে মাত্র ৬ ঘন্টা। চুপসে গিয়ে নরম করে বলল, “makes sense!” আরেকজন ৪২ঘন্টা দেখে অবিশ্বাসের সুরে জানতে চাইল, এই সময় কোথায় যাচ্ছে? আমি ত দেখতে পাচ্ছিনা। তখন ওরা বুঝিয়ে বলল, হয়ত তুমি ভাবছ তুমি ড্রাইভ কর দশ মিনিট। কিন্তু আসলে বাসার দরজা থেকে বের হওয়ার পর থেকে পার্কিং পেয়ে হেঁটে জায়গামত পৌঁছুতে হয়ত তোমার লাগে ত্রিশ মিনিট। তারপর ক্লাশের আগে পরে দশ পনের মিনিট হয়ত এমনিই চলে যাচ্ছে, তুমি হিসাবে ধরনি। এমনিতে দেখতে দশ পনের মিনিট তেমন কিছুই না, কিন্তু দিনে পাঁচ ছ’ বার অমন হলে কিন্তু দেড় ঘন্টা এভাবেই চলে যাচ্ছে, সপ্তাহ শেষে দাঁড়াচ্ছে সাড়ে দশ ঘন্টা।

মনে ধরল। আরও মনে ধরল পরের কথাটা। ওরা বলল, হারিয়ে যাওয়া সময়কে ধরতে একটা সপ্তাহ একটু ট্র্যাক করুন, কী কী কাজ করছেন। জিমেইলে ত একটা ক্যালেন্ডার ফ্রি ফ্রি আছেই। সেখানে লিখতে থাকুন পুরো এক সপ্তাহ প্রতি ঘন্টার হিসেব। দেখবেন একটা প্যাটার্ণ খুঁজে পাচ্ছেন। তখন বুঝতে সুবিধা হবে কোথা থেকে সময় কেটে কোথায় জোড়া লাগাতে হবে।

গত দু’দিন ধরে কাজটা করছি। আপাতত এই সপ্তাহান্তের হিসাব বলছে ব্লগিং এর চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় খরচ হচ্ছে ঘরকন্নায়। দেখা যাক আরো এক সপ্তাহ কী বলে!

দুরন্ত সময়কে বেঁধে ফেলতে পরের টিপ ছিল মাল্টিটাস্কিং (একই সাথে কয়েকটা কাজ করা।) যেমন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে রেকর্ড করা ক্লাসের লেকচারগুলো একবার শুনে ফেলা। অলস ব্রাউজিং এর ফাঁকেই অনলাইন বিলগুলো দিয়ে ফেলা। ইউটিউব দেখতে দেখতে ঘরের হাল্কা কাজ, যেমন কাপড় গুছানো, ডিশ ক্লিনিং – এগুলো করে ফেলা। ভেবে দেখলাম আমি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাল্টি টাস্কিং করি। যেমন রান্না করার সময় তাফসিরের লেকচার শুনি, আর অলস ব্রাউজিং এর সময়টাতে লেখালেখি করি বা কাউন্সেলিং এর মেইলগুলোর উত্তর দেই।

কিন্তু মাল্টিটাস্কিং করা যায় একটা হাল্কা কাজের সাথে একটা প্রিয় কাজকে জোড়া লাগিয়ে। যখন বিতিকিচ্ছিরি একটা কাজ করা দরকার, তখন? মানে বলতে চাইছি, জঘন্য খান তিরিশেক আর্টিকেল ঘেঁটে রিসার্চ প্রপোজাল দাঁড় করাতে হবে যখন, তখন? বা বসের চেহারা মনে করেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এমন কোন কাজের ডেডলাইন যখন শেষ হয় হয়? তখন আমরা কী করি?

দেখা গেছে এ সময়টাতে (অর্থাৎ চরম বিকর্ষণ হয় এমন কাজে) অমনোযোগিতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। মানুষ হয় কাজটা ফেলে রাখতে রাখতে একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখে (প্রোক্র্যাস্টিনেশন), অথবা আগে শুরু করলেও সময়টা ঠিকমত কাজে লাগায় না। আমি আমার বেলায় দেখেছি, চারদিনব্যাপী একটা রাইটিং ওয়ার্কশপে নিয়ম ছিল তিনঘন্টার একেকটা সেগমেন্ট এ বসে টানা লিখতে হবে। একেকসময় মাথার তার ছিঁড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়, মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বিবাগী হয়ে যাই। কী যে অসহ্য লাগে! স্বাধীনভাবে পড়াশুনা করার সময় ত আর কেউ নিয়ম করে রাখেনা! তাই মনে বিরাগের উদয় হলেই আমরা ইউটিউবে পালাই।

এসব ক্ষেত্রে ওদের পরামর্শ ছিল, একদিনের কাজের তালিকায় যদি সমান গুরূত্বপূর্ণ দু’টো কাজ থাকে, তাহলে কঠিন আর করতে ভাল লাগেনা এমন কাজটা আগে করা (অথচ আমরা ঠিক তার উল্টোটাই করি সবসময়।)

তালিকার কথায় যখন আসলামই, আরেকটা কথা বলে শেষ করি। কোন একটা সময় করে মাসিক, সাপ্তাহিক আর দৈনিক কাজের তালিকা করে রাখলে ফোকাস ঠিক রাখা যায়। কিন্তু প্রথম প্রথম তালিকা করতে নিলে আমরা উৎসাহের চোটে পৃথিবীর যাবতীয় ভাল কাজের লিস্টি করে ফেলি। তা করা যাবেনা। রিয়েলিস্টিক হতে হবে। ঐ যে বললাম এক সপ্তাহ নিজের রুটিন ট্র্যাক করা – ওটা করে তারপর যদি দেখা যায় দিনে ক্রিকেট খেলা অবলোকন বাবদ দশ ঘন্টা সময় ব্যয় করেন, তাহলে রুটিনে তাই লিখুন, এক লাফে একঘন্টায় নামিয়ে আনতে যাবেন না যেন! দিনের রুটিনে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রিয় কাজ, অপ্রিয় কাজ, বিশ্রাম – সব মিলিয়েই একটা প্ল্যান করুন। মনে রাখবেন, যে প্ল্যান মেনে চলা সম্ভব না, সেটা আসলে কোন প্ল্যানই না, সেটা ফ্যান্টাসি।

সুন্দর করে প্ল্যান করলেই কিন্তু কাজ শেষ না। নিয়মিত প্ল্যানটাকে ঝালাই করতে হবে। কী লিখেছিলাম, তার কতদূর সফল হতে পেরেছি – সফল না হলে কোন্ কোন্ বিষয়গুলোর কারণে হতে পারিনি – এসব খতিয়ে দেখে আবারো প্ল্যানটা গুছাতে হবে.. ইত্যাদি ইত্যাদি।

সব মিলিয়ে, এখন কীভাবে সময় কাটাচ্ছি, আর কীভাবে কাটানো উচিৎ – সেটার মধ্যে সামঞ্জস্য করাই টাইম ম্যানেজমেন্ট। মুসলিমদের জন্য ত টাইম ম্যানেজমেন্ট অপরিহার্য। সূরা আসরে ত আল্লাহ বলেই দিয়েছেন টাইম ম্যানেজমেন্ট না জানা সব মানুষ বিপদের মধ্যে আছে।

* * * * * * * * * *
লেখক সম্পর্কে:

নূসরাত রহমান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মেরিল্যান্ডে বায়োলজিতে পিএইচডি করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজির ছাত্রী ছিলেন তিনি । বিজ্ঞান থেকে যুক্তি ও বিশ্লেষণ শিখে পারিপার্শ্বিকতার কাছ থেকে দর্শন ও মূল্যবোধ গ্রহনের মাধ্যমে তিনি তার উপলব্ধিকে লেখার উপজীব্য করেছেন।

ব্যক্তিগত ব্লগ লিঙ্ক

Advertisements
7 টি মন্তব্য leave one →
  1. অক্টোবর 15, 2012 12:28 অপরাহ্ন

    লিখাটা বেশ ভালো লাগসে । সেভ করে রাখলাম । অনেক ব্যাপার মনে রাখা সম্ভব না 😛 তাই বার বার পড়তে হবে ।

    থেঙ্কু এই লিখাটার জন্য । কয়েকদিন ধৈরা বৈরাগীর মত ঘুরতাসি টাইম ম্যানেজম্যান্টের অভাবে 😀

  2. tazul permalink
    অক্টোবর 22, 2012 10:58 অপরাহ্ন

    mashallah amar moto chorom olosh manusher jonnobapokupokari lekha likhsen apu 🙂 🙂

  3. Eyamin Hossain permalink
    মার্চ 1, 2013 8:50 পুর্বাহ্ন

    Khub valo laglo.
    Anek dhonyobad apnake.

  4. আব্দুল্লাহ permalink
    জানুয়ারি 21, 2014 5:26 অপরাহ্ন

    টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে একটা ভাল লেকচার আছে কালামুল্লাহ তে কেউ চাইলে ডাউনলোড করে শুনতে পারেন।

    • Asif ashkar permalink
      ফেব্রুয়ারি 27, 2014 12:20 পুর্বাহ্ন

      kalamullah’r lecture tar link ta den plz…

  5. ফরিদ উদ্দিন আহমদ permalink
    ডিসেম্বর 24, 2014 1:17 অপরাহ্ন

    মাত্র কিছুদিন হল আপনার লেখা পড়ছি। আমি খুব ভাল কিছু জেনেছি। আপনার লেখা আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আপনি আরো লিখবেন। আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখবেন।

Trackbacks

  1. স্কিল ডেভেলপমেন্ট সিরিজ: মোটিভেশন « আলোর পথে

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: