Skip to content

তারিক রামাদান ও তার চিন্তাধারা :: আবু এন এম ওয়াহিদ

অগাষ্ট 30, 2012


মুসলিম দেশগুলোতে অনেক বড় বড় আলেম আছেন যারা কুরআন-হাদিসে গভীর জ্ঞান রাখেন, কিন্তু তাদের প্রায় সবাই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতির মারপ্যাঁচে সমানভাবে পারদর্শী নন। তার ওপর বর্তমানকালে মানুষের জীবন, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মনস্তত্ত্ব, কর্মকৌশল ইত্যাদি দেড়-দুই হাজার বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল, কঠিন ও মাল্টিডাইমেনশনাল। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মচর্চা, ক্রমাগত প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে তাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দ্বারা। এ বাস্তবতায় সনাতনী পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে মানবজীবনের যাবতীয় জটিল সমস্যার সঠিক সমাধান দেয়া সম্ভব নয়।

এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে হাতেগোনা যে ক’জন মুসলিম চিন্তাবিদ সাম্প্রতিককালে সারা দুনিয়ায় সাড়া জাগিয়েছেন, তাদের মধ্যে আমি অন্তত পাঁচজনকে শনাক্ত করতে পেরেছি। এর মধ্যে তিনজনই ইন্তেকাল করেছেন। মুহাম্মদ আসাদ (১৯০০-১৯৯২), ফজলুর রহমান (১৯১১-১৯৮৮) ও ইসমাইল আল ফারুকী (১৯২১-১৯৮৬)। যে দু’জন জীবিত আছেন তারা প্রায় একই বয়সী। তারিক রামাদান (১৯৬২-) এবং খালেদ আবু এল ফাদল (১৯৬৩-)। যদিও তাদের কারো কারো ব্যাপারে ট্র্যাডিশনাল আলেমদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকতে পারে। এদের সবার জীবনসংগ্রাম ও চিন্তাধারার সাথে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের পরিচয় থাকা উচিত। আর এ প্রয়োজন মেটাতে আজ আমি পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি তারিক রামাদানের জীবন ও তার চিন্তাধারা। তারিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন ইসলামি চিন্তাবিদ, অধ্যাপক, লেখক, গবেষক, আলোচক, বিশ্লেষক ও উপস্থাপক। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কন্টেম্পোরারি ইসলামিক অ্যান্ড অরিয়েন্টাল স্টাডিজের প্রফেসর।

তারিক রামাদানের জন্ম ১৯৬২ সালের ২৬ আগস্ট, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। তারিকের বাবার নাম সাঈদ রামাদান ও মায়ের নাম ওয়াফা আল বান্না। তারিকের নানা ছিলেন মিসরের বিখ্যাত দার্শনিক ও অ্যাক্টিভিস্ট হাসান আল বান্না, যিনি ১৯২৮ সালে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। ৮৪ বছর পর সেই ব্রাদারহুডের নেতা মুহাম্মদ মুরসি গণতান্ত্রিক মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তারিকের বাবা সাঈদ রামাদান ব্রাদারহুডের রাজনীতির সাথে প্রত্যভাবে জড়িত থাকায় মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের তাকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। সাঈদও আধুনিক ও ইসলামি জ্ঞানে সমান পারদর্শী ছিলেন। তার আরেকটি পরিচয় হলো তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সামাজিক ও ইসলামি অ্যাক্টিভিস্ট ম্যালকম এক্সের একজন মেন্টর ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ম্যালকম হজ পালন করে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পথে জেনেভায় কয়েক দিনের জন্য সাঈদ রামাদানের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। সেখানে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সাঈদের কাছেই ম্যালকম প্রথমবারের মতো ইসলাম ও ইসলামের শাশ্বত বাণী আত্মস্থ করেন। পরে ম্যালকম তার শেষ জীবনে সাঈদের কাছে লেখা এক চিঠিতে এ কথা অকপটে স্বীকার করেন।

বিদেশের মাটিতে জেনেভায় তারিকের জন্ম এবং সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। তিনি ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা থেকে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট, মাস্টার্স ও পিএইচডি লাভ করেন। তার স্পেশালিটি হলো সমসাময়িককালের ইসলাম ও ইসলামিক স্টাডিজ। ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর লেখাপড়া ও গবেষণার জন্য তিনি কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। সুইজারল্যান্ডের কলেজ ডি সোসুরেতে শিকতা দিয়ে তারিক শুরু করেন তার পেশাজীবনের দুর্গম যাত্রা। কিছু দিন জেনেভায় চাকরি করার পর ২০০৫ সালে তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্টোনি কলেজে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যোগ দেন। ২০০৭ সালে তিনি নেদারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লেইডেনে আসেন ইসলামিক স্টাডিজের প্রফেসর হয়ে। অল্প দিন পর লেইডেন ছেড়ে তিনি যোগ দেন রটারড্যামের ইরামুস ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৯ সালে তারিক আবার ফিরে যান অক্সফোর্ডে। এবার তাকে অফার করা হয় সম্মানিত ‘হামাদ বিল খলিফা আল সানি’ অ্যান্ডাউড চেয়ার। এ চেয়ার বিশেষ করে সৃষ্টি করা হয়েছিল সমসাময়িক ইসলামিক ও অরিয়েন্টাল স্টাডিজের জন্য।

সুইজারল্যান্ডে থাকতে তরুণ বয়সে তারিক মুভমেন্ট অব সুইস মুসলিম নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এর মূল কাজ ছিল দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইন্টার ফেইথ ডায়ালগের মাধ্যমে সুইসদের মধ্যে ইসলামের সঠিক ও যুগোপযোগী বাণী পৌঁছে দেয়া। এসব ডায়ালগে তারিক সরাসরি অংশ নিতেন। ইসলামি চিন্তার জগতে এভাবেই শুরু হয় তারিকের পরিচিতি। সাথে সাথে তিনি ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম বিষয়ে চালিয়ে যান লেখাপড়া ও সিরিয়াস গবেষণা। পরবর্তী পর্যায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে নিয়োগ দেয় ধর্মবিষয়ক একজন উপদেষ্টা হিসেবে। এই সুবাদে তিনি ইইউ কমিশন অন ইসলাম অ্যান্ড সেকুলারিজমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে সময়ে সময়ে উপদেশ-পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ধর্মীয় বিষয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্সে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তিনি ব্রাসেলস বেসড থিঙ্কট্যাঙ্ক ইউরো-মুসলিম নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট। তার দাওয়া সংক্রান্ত প্রায় ১০০ টেপ বা সিডি আছে, যেগুলো প্রতি বছর দুনিয়াজোড়া হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়।

একপর্যায়ে তারিক মুসলিম বিশ্বের স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে কঠিন ও কঠোর বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। যার ফলে ২০০৯ সালে তাকে মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া ও সৌদি আরবে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। তারিকের মতো স্বাধীনচেতা তেজি পুরুষ এসবের ধার ধারেন না। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকারের একজন বড় প্রবক্তা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এমনকি স্বৈরাচারী মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি তিনি কড়া বক্তব্য রাখতে একচুলও বিচলিত হন না। যার কারণে এসব দেশের সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করে এবং এখনো করছে। ২০০৪ সালে আমেরিকার বিখ্যাত নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে লুস অ্যান্ডাউড চেয়ার অফার করে, কিন্তু মার্কিন ভিসা না পাওয়ায় তিনি এ চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ২০০৪ সালে বুশ প্রশাসন তার ওপর ভিসা অ্যাম্বার্গো দিয়ে রাখে। এ সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারিকের হয়ে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইউনিভার্সিটি প্রফেসারস, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব রিলিজিওন, পেন অমেরিকান সেন্টার, ইউসিএলএ ও আরো অনেক প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে আইনি লড়াই করে। অবশেষে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে তারই জয় হয়। ২০১০ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রধান হিলারি কিনটন তারিকের ওপর থেকে আমেরিকা আসার ভিসা অ্যাম্বার্গো তুলে নিতে বাধ্য হন। সে বছরই ৮ এপ্রিল তিনি নিউ ইয়র্কের কুপার ইউনিয়ন গ্রেট হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন।

তারিক রামাদান মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলমানেরা যা করে থাকেন তার সব কিছু ইসলাম নয়। তাদের বেশ কিছু কাজকর্ম আপাতদৃষ্টিতে ধর্মীয় মনে হলেও আসলে সেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো নিতান্তই তাদের আঞ্চলিক সংস্কৃতি বা চালচলনের অংশ। তাই তার মতে, বোঝার সুবিধার জন্য ধর্মের সাথে সংস্কৃতি ও রীতিনীতির একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা উচিত। তিনি আরো মনে করেন, নাগরিকত্ব ও নাগরিক অধিকারের চর্চা এবং ধর্ম ও ধর্ম পালন এক নয়। যেমন যেকোনো দেশের নাগরিক হিসেবে মুসলমানদেরও সে দেশের আইন মেনে চলার ওপর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ধর্মের সাথে এর কোনো সঙ্ঘাত নেই। কিন্তু অনেকে জ্ঞানের অভাবে কৃত্রিমভাবে এখানে অযাচিত একটি সঙ্ঘাত সৃষ্টি করে সমস্যায় নতুন মাত্রা যোগ করে থাকেন। তারিক এ ব্যাপারে বিদেশে বসবাসরত সব মুসলমানকে সব সময় সজাগ ও সাবধান থাকতে বলেন।

তারিক মনে করেন, ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসকারী মুসলমানদের উচিত পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করে সেইমতো জীবন যাপন করতে। তিনি সনাতনী ‘দারুল ইসলাম’ (অ্যাবোড অব পিস) ও ‘দারুল হারব’ (অ্যাবোড অব ওয়ার) বলে দ্বিপক্ষীয় বিভাজনকে গ্রহণ করেন না। তিনি বলেন, এ রকম কোনো কিছু কুরআনে নেই। তারিকের মতে, এ দুটোর মাঝখানে আরেকটি অবস্থান থাকতে পারে, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন ‘দারুল দাওয়া’ (অ্যাবোড অব ইনভাইটেশন)। তিনি ইউরোপ-আমেরিকার মুসলমানদের বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং আলাদা না থেকে পাশ্চাত্য সমাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর বেশি জোর দেন। তিনি বলেন, ইউরোপ-আমেরিকা দারুল হারব নয়, দারুল দাওয়াও নয়; বরং এটা ‘দারুল শাহাদাহ’ (অ্যাবোড অব টেস্টিমনি)। কারণ আল্লাহ পৃথিবীতে মুসলমানদের পাঠিয়েছেন অন্য সবার ওপর সাীস্বরূপ। তিনি অভিবাসী মুসলমানদের পাশ্চাত্যের সাথে একাত্মতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে থাকেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন হিউম্যান ব্রাদারহুডের ওপর। এখানে মুসলমানদের দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদেশী সরকারের কাছে প্রটেকশনের দাবি নয়, বরং কনট্রিবিউশনের সুযোগ চাওয়া।

তারিক রামাদান ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ (উই ভার্সাস দে) ডকট্রিনে বিশ্বাস করেন না। তার মতে, মুসলিম-অমুসলিম যাই হোক; প্রতিবেশী ও কমিউনিটির প্রতি সঠিকভাবে নাগরিক দায়িত্ব পালনও ইসলাম ধর্মেরই একটি অংশ। মুসলমান সমাজে স্বৈরাচারী শাসক এবং মুসলিম দেশে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের অভাবের কারণে পশ্চিমাদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে মারাত্মক ভুল ধারণা রয়েছে। এ বিষয়টি তাকে খুব গভীরভাবে ভাবায় এবং তিনি মনে করেন এর দায়ভার মুসলমানদেরই এবং তাদেরকেই এটা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে হবে। তারিকের মতে, ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলিম তরুণ প্রজন্ম যত বেশি সে দেশের ভাষায় ইসলাম ও ইসলামের দর্শনচর্চা করবে, গবেষণা করবে, লেখালেখি করবে তত তাড়াতাড়ি মুসলমানেরা বিদেশের মাটিতে তাদের এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। তারিক আরো মনে করেন, বিদেশে বসবাসকারী মুসলমানেরা সব ব্যাপারে অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ এবং তারা তাদের ধর্মের দর্শনকে অভিবাসী দেশের মানুষের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছেন না।

তারিক মনে করেন, পশ্চিমাদের চাপে নয়, নিজ থেকেই মুসলমানদের উচিত সর্বপ্রকার হুদুদ আইন প্রয়োগের ওপর আপাতত মরেটোরিয়াম অরোপ করা। ইতোমধ্যে ইসলামি চিন্তাবিদেরা পরিবেশ, পরিপ্রেতি ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি নিয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অনেক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হুদুদ আইনের ব্যাপক অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এতে এক দিকে রাজা-বাদশাহ এবং সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা বিচারের ঊর্ধ্বে রয়ে যাচ্ছে এবং অন্য দিকে সমাজের অপোকৃত দুর্বল বিশেষ করে গরিব ও নারীসমাজ ভিকটিম হচ্ছে। তিনি একটি কথা সব সময় বলে থাকেন, ইমপ্লিমেন্ট জাস্টিস নট পানিশমেন্ট। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তিনি নিষ্ফল ইসলামি রাজনীতির চেয়ে রাজনীতিতে ইসলামী নীতি-আদর্শ, অর্থাৎ ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাসহ কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এখানে তারিকের সপে যা বলা যায় তা হলো, ইসলামি সমাজ একটি কল্যাণকামী সমাজ এবং কোনোক্রমেই সেটা পুলিশি সমাজ নয়। রাসূলুল্লাহ সা: সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পে এবং জুলুমের বিরুদ্ধে খুবই স্পর্শকাতর, যত্নশীল ও সোচ্চার ছিলেন। পান্তরে কারো বিরুদ্ধে শাস্তি প্রয়োগের বেলায় কখনোই তিনি আগবেড়ে অতি উৎসাহী ছিলেন না। ইতিহাসে এ মর্মে অনেক উদাহরণ আছে।

তারিক মনে করেন, মুসলমানেরা ইসলামের ওপর পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টের বক্তব্যে মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তার মতে, এটা করে মুসলিম দেশগুলোর স্বৈরাচারী শাসকেরা সাধারণ নাগরিকদের ওপর তাদের জুলুম, অনাচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা করেছে। তারিক আরো মনে করেন, সুইসাইড বোম্বিং ও ভায়োলেন্স কোনো যুদ্ধের কৌশল হতে পারে না; সে যে যুদ্ধই হোক, যে অবস্থাতেই হোক। এটা পরিষ্কারভাবে ইসলামবিরুদ্ধ কাজ। মানুষ কেন টেররিজমের আশ্রয় নেয়, তার মোটিভেশন বোধগম্য হলেও তিনি কৌশল হিসেবে টেররিজম কিংবা ভায়োলেন্সকে ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত মনে করেন না।

তারিক ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এবং ইরাকিদের রেজিস্ট্যান্সকে তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন; তবে সেখানেও তিনি সুইসাইড বোম্বিং এবং কোনো ধরনের টেররিজমকে সমর্থন করেননি। তিনি ফ্রান্সে সেকুলারিজমের নামে স্কুলে এবং পাবলিক প্লেসে ইসলামি অনুশাসনের ওপর ক্রেকডাউনের ঘোর বিরোধী। এ নিয়ে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজির সাথে তার তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। ইসরাইলকে রা করতে মানবাধিকারে ছাড় দেয়ায় তিনি ফরাসি ইহুদি বুদ্ধিজীবীদেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন।
তারিক রামাদান বর্তমান বিশ্বের সাতজন প্রভাবশালী ধর্মীয় চিন্তাবিদের একজন। ২০০০ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে পৃথিবীর সেরা ১০০ জন বুদ্ধিজীবীর অন্যতম মনোনীত করেছে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন তারিককে পৃথিবীর সেরা ১০০ জন চিন্তাবিদের মধ্যে ৪৯তম স্থান দিয়েছে। ওপেন অনলাইন পোলের মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রসপেক্ট ম্যাগাজিন পৃথিবীর ১০০ জন পাবলিক চিন্তাবিদের মধ্যে তারিককে অষ্টম স্থানে প্লেস করেছে। তিনি সমসাময়িক ইসলাম, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অসংখ্য বই লিখেছেন। তারিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সামাজিক, ধর্মীয় ও উচ্চশিা প্রতিষ্ঠানে হরহামেশা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে থাকেন। ইউটিউবে তার অনেক মূল্যবান প্যানেল ডিসকাশন সাধারণ শ্রোতা-দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।


* * * * * *
লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি ও এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ
awahid2569@gmail.com

দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত। লিঙ্কঃ http://www.dailynayadiganta.com/details/65939

Advertisements
No comments yet

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: