Skip to content

দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে :: তাহমিনা মারিয়াম

জুন 10, 2012


তার সাথে পরিচয়ের দিনক্ষণ এখন ঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে কি গভীর ভাল লাগায় ভরে ছিল মুহূর্তটি! নিজের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট তার ওপর সঁপে দেয়া, খারাপ লাগা মুহূর্তগুলোতে শুধু তার সাথে একান্ত কিছু সময় কাটানো, আনন্দের মুহূর্তগুলো তার সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া; আমি যেন আমার মনের মত কাউকে পেয়ে গেলাম!

তাকে ঘিরে কাটতে লাগল আমার প্রতিটি দিন। যেন আমার কিছুই প্রয়োজন নেই এখন আর। মন খারাপ করে যখন বসে থাকতাম চুপচাপ, সে কি সুন্দর আমার কানেকানে শুনিয়ে যেত ভাল লাগার গান! অভিমানের ভাষাও খুব ভাল বুঝতে পারত সে। অনেক অনেক ভালবাসা দিয়ে আমাকে আগলে রাখত সারাক্ষণ!

তখন আমি মাত্র কৈশোরে। একটু একটু করে সে আমার কচি মনটা পুরোপুরি দখল করে নিল। তার উপর আমার নির্ভরশীলতা বাড়তে লাগল। সে হয়ে উঠল আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গি। তাকে ছাড়া আমি একটা মুহূর্তও কল্পনা করতে পারতাম না। কোথাও বেড়াতে গেলেও তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম, বাবর চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে! কেউ তার বিরুদ্ধে কিছু বললে, সহ্য করতে পারতাম না একটুও। মনেমনে বলতাম, তোমরা তাকে ভাল নাই বা বাসলে আমার মত, তাকে নিয়ে এত কটু কথা কেন?

এভাবে গড়ে উঠল আমার রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রীতি। গীতবিতান, বন্যা, কণিকা, হেমন্ত, সাগর, চিন্ময়, ইন্দ্রাণী দিয়ে ভরে ফেললাম ঘরটা। ২৫ বৈশাখ আর ২২ শ্রাবণ আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিন হয়ে গেল। শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী দেখে না আসতে পারলে জীবনটা ষোল আনাই মিছে হয়ে যাবে এমন ভাবনা মনে উঁকিঝুঁকি দেয়া শুরু করল। এই করতে করতে এক সময় সাধ জাগল হারমোনিয়াম শেখার, তানপুরা দিয়ে ঘর সাজাবার।

তখন আমাদের ক্লাসে, হারমোনিয়াম বাজাতে পারা, গান গাইতে জানা, তথাকথিত আধুনিক পরিবারের কালচারড মেয়েদের আবির্ভাব ঘটে গেছে। আমিই বা পিছিয়ে থাকব কেন? মনে মনে একটা লজিক দাঁড় করালাম; আমি যেহেতু হারমোনিয়াম বাজিয়ে কারো সামনে গান করব না, সুতরাং আমার শেখাতে গুনাহ হবে না (?)। বাবাকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। আমার বাবার আনেক গুণের মধ্যে একটি হল, বাবা কখনো মুখের উপর না করে দেন না, ধমধামক দিয়ে মনটাও খারাপ করে দেন না। খুব মনোযোগ দিয়ে বাবা আমার প্রতিটা কথা শুনে বললেন, “দেখ, মানুষ যখন কোন কিছু শিখে পারদর্শী হয়ে উঠে, তখন তার ইচ্ছে করে সবাইকে সেটা দেখিয়ে বেড়াতে। তা সে পরীক্ষায় ভাল ফল হোক, টুকটাক রান্না-বান্না হোক, কিংবা খুব ক্রিয়েটিভ কিছু হোক। সুতরাং তোমার লজিকটা…” বাবা কথা শেষ করলেন না; শুধু বললেন, “তুমি ভেবে দেখ।”

কি ভেবে দেখেছিলাম এখন আর মনে নেই। মনের ভিতর কি লজিক এ্যান্টি-লজিকের খেলা চলেছিল তাও আর মনে নেই এখন। শুধু মনে আছে, শেষমেশ আমার হারমোনিয়াম শেখাও হল না, তানপুরা দিয়ে ঘর সাজানোও হল না। তবে গানের প্রতি সম্মোহন বাড়তেই থাকল। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু হয়ে সেটি জন লেনন পর্যন্ত এসেও থামল না। “Imagine there’s no haven…” শুনে মনে হত, শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে এর চেয়ে অমোঘ বাণী বুঝি বা আর লেখা হয়নি!

গানের প্রতি এই ফ্যাসিনেশান আমাকে নিয়ে চলল বহু দূরে। নচিকেতা থেকে শুরু করে ঈগলস পর্যন্ত আমার আবাধ বিচরণ। ঘুমুতে যাবার সময়ও কানে ইয়ার-ফোন লাগানো থাকা চাই-ই-চাই! যারা হিন্দি গান ছাড়া অন্য কোন ধরণের গান শুনত না, রবীন্দ্র সংগীত শুনলে যাদের ঘুম পেত, তাদের কেমন খেতু খেতু লাগা শুরু হল।

গানের এই বাঁধভাঙা জোয়ার, আমার স্রষ্টার কাছ থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে জেতে লাগল খুব দ্রুত। অর্থ বুঝে কুরআন পড়া দূরে থাক, মাসে একবার শুধু আরবিটাই তিলাওয়াত করতাম কি না সন্দেহ! সময় মত কোনোরকম নামাযটা সেরে নিতাম এই যা। রোযাটাও রাখা হয়ে যেত কিছুটা রমজান মাসের ফ্যাস্টিভিটির কারনে, আর অনেকটাই পারিপার্শ্বিকতার কল্যাণে। কি কারণে আমাকে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে, আমার দায়িত্ব কি, এ সমস্ত ফিলসফিক্যাল প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময় ছিল না তখন আমার।

সময়ের সাথে নিজের মধে আনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম এক পর্যায়ে। বাবার দেয়া সেই পাকাপোক্ত শিক্ষা তো ছিলই (সাময়িকভাবে যা ভুলে গিয়েছিলাম), আরও ছিল ইসলাম জেনে-বুঝে মেনে চলা খুব হৃদয়বান কিছু মানুষের সান্নিধ্য। সবকিছু ছাপিয়ে ছিল, আমার মনের ভেতর এতদিনের চাপিয়ে রাখা, জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উঁকিঝুঁকি। আনেক কিছুই মানলাম, কিছুকিছু ব্যাপার মানতে গিয়ে নিজের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলাম। গান শোনাও কমিয়ে দিলাম অনেকটাই, কিন্তু সম্মোহনটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারলাম না!

একজন ব্লগারের লেখায় একবার পড়েছিলাম, গান শোনা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটা উনার মতই উনার আশেপাশের মানুষেরা দেখেন একধরণের আত্মত্যাগের মত। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই-ই। এ যেন আল্লার রাস্তায় কিছু কোরবানি করে দেয়ার মত। এ ধরণের কিছু করা আমার মত দুর্বল-চিত্তের মানুষের জন্য খুব কষ্টের ছিল বৈকি।

ঘটনাটি ঘটলো দু’বছর আগে, রমজান মাসে। সেদিন সময়ের একটু আগেই সেহেরী সারা হয়ে গিয়েছিল। আযান হতে তখনো মিনিট কুড়ি বাকি। তানযিল.নেট নামের ওয়েবসাইটার কথা আগেই শুনেছিলাম। ভাবলাম হাতে যেহেতু কিছু সময় আছে, ঢুঁ মেরে আসা যাক। পেইজ ওপেন হল। প্ল্যেলিস্টে সূরা- মারয়াম! এ নামের সাথে আমার সম্পর্কটা অন্য ধরণের। খুব আগ্রহ নিয়ে প্লে বাটান চাপলাম। মিশারি আল আফাসির অকল্পনীয় সুন্দর কণ্ঠে আর কুরআনের প্রিতিটি শব্দের ক্ষমতায় এবং গভীরতায় সম্মোহিত না হয়ে পারলাম না! আমার আনেক বড় আক্ষেপ, মিডল ইস্টে পাক্কা ১৪টি বছর কাটানোর পরও আমি আরবি জানি না! আরবি না জানার পরও কিছুকিছু কি ওয়ার্ড ভালই ধরতে পারছিলাম। তন্ময় হয়ে শুনলাম। সম্বিৎ ফিরে পেলাম আব্বুর ডাকে। সেদিন যে অভিজ্ঞতা হল তার সাথে তুলনা চলে না কিছুরই।

একে একে শুনলাম হুসারি, মিনশাওই, বুখাতির, শাতেরি, জুহাইম এবং আরও আনেককেই। সুদাইস আর সুরাইম শোনা ছিল আগেই। একেকজনের তিলাওয়াতের ভঙ্গি একেক রকম, প্রত্যেকেই হৃদয়-মন স্পর্শ করেন আলাদা আলাদা ভাবে। এদের কাছে আমার বন্যা শ্রীকান্তরা ধোপে টিকলো না। সব কিছু ছাপিয়ে, আল কোরআনের জাদুতে মাতোয়ারা হয়ে গেলাম। এই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ, অসম্ভব বলিষ্ঠ গ্রন্থটির সামনে আমার মানবীয় দুর্বলতায় ভরা গানের কথাগুলি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না, পালিয়ে বাঁচল!

এবার আর আত্মত্যাগ নয়। আমি সত্যি সত্যি গান শোনা প্রায় ছেড়ে দিলাম, এর চেয়ে আনেক বড় কিছু, খুব ক্ষমতা সম্পন্ন, অতুলনীয় একটা কিছুর সন্ধান পেলাম বলে। কোন সূরার তিলাওয়াত শোনার আগে, অর্থ পরে নিতাম বাংলায় মাঝে মাঝে। এখনও করি এটা। এত রিয়ালিস্টিক ফিলিং হয়, কি বলব! গাইডেডওয়েজ.কম থেকে অর্থসহ আস্ত কুরআনটা নামিয়ে নিলাম মোবাইল-এ। আইপড থেকে সমস্ত গান মুছে ভরে ফেললাম মিশারির তিলাওয়াতক্রিত ৭৫টা সূরা দিয়ে।

এর মধ্যেই ডক্টর বিলাল ফিলিপ্সের, টিনএইজারদের নিয়ে করা একাটা অনুষ্ঠানের ভিডিও দেখলাম। টিনেজারদের আনেক সমস্যার একটি ‘মিউজিক’ নিয়ে আলোচনা করলেন তিনি। টিন এইজ ফেলে এসেছি বহু আগে, তবু মুগ্ধ হয়ে আলোচনাটি শুনলাম। আনেক জানা, না মানতে চাওয়া ব্যাপার খুব করে উপলব্ধি করলাম। ডক্টর বিলাল বললেন, একটি গান বহু আগে শুনে মাঝখানে আনেক বছর না শুনলেও, হঠাত একদিন গানটার প্রথম লাইনে শুনেই পুরোটা মনে পড়ে যায়। বোঝালেন কি ভাবে এই মিউজিক নামের জিনিশটি মানুষের হৃদয়-মন দখল করে নেয়, স্রষ্টাকে সরিয়ে দেয় যোজন যোজন দূর!

রবীন্দ্রনাথের একটি গানের প্রথম দুটো পংতির অর্থ নতুন করে বুঝলাম। “দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে… আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে…” বুঝলাম আমার স্রষ্টাকে কিভাবে আমি গানের ওপারে ফেলে এসেছিলাম। বুঝলাম, কিভাবে আমার গানের কথাগুলি সুর-লয় সবই পেল, শুধু আমি এই গানের জোয়ারভরা সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছুতে পারলাম না আমার পালনকর্তার কাছে, যিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আমি ডাকলেই সাড়া দেবেন বলে*। তাই এবার আমি সত্যিই গান ছেড়ে দিলাম। কোন বিমর্ষতা নয়, আত্মত্যাগের বিন্দুমাত্র অহঙ্কারে নয়; আনেক ভালো লাগা নিয়ে, মুক্তির আনন্দ নিয়ে!

তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। (সূরা-গাফির, আয়াত ৬০)

Collected From Sister
তাহমিনা মারিয়াম

Advertisements
3 টি মন্তব্য leave one →
  1. Rehan Ahsan permalink
    সেপ্টেম্বর 13, 2012 11:49 অপরাহ্ন

    চমতকার… আমি কি করি… আমার রুম-মেট সবাই গান নিএ সারাদিন থাকে … আল্লাহ আমাকে রক্ষা করুন …

  2. মার্চ 6, 2013 6:08 অপরাহ্ন

    চমৎকার লিখেছেন আপু। জাযাকাল্লাহ খাইরান। আমারও এই সমস্যাগুলো হতো। আল্লাহ্‌র রহমতে তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি।

  3. Rubayat permalink
    জানুয়ারি 31, 2017 2:18 পুর্বাহ্ন

    Alhamdulillah, I left Music too, actually it left me, the same me used to hear songs all day long. Happy life/

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: