Skip to content

ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম জাগরণ :: শাহ আবদুল হান্নান

এপ্রিল 24, 2012

আমি নিজে জীবনে ইতিহাস অনেক পড়েছি। আমি পাক-ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস পড়েছি। মুসলিম ইতিহাস পড়েছি। জাপান, রাশিয়ার ইতিহাস পড়েছি। ইউরোপ আমেরিকার ইতিহাস পড়েছি। আমি আরবদের ইতিহাস পড়েছি। শুধু বলা যায় আফ্রিকার গ্রেটার পার্টের ইতিহাস আমার পড়া হয়নি। ইতিহাস পড়ে বুঝলাম ইতিহাস হলো একটা বড় শিক্ষক। মানুষ কি কি ভালো কাজ করেছে এবং সেটা কারা করেছে, তাদের কি যোগ্যতা ছিল, কোন কোন পরিস্থিতিতে সফল হওয়া যায় তা ইতিহাস পাঠে জানা যায়। এখানে ব্যক্তিগত একটা বিষয় থাকে যে লোকটা কত যোগ্য। আবার পরিস্থিতির একটা ব্যাপার থাকে। অনেক সময় যোগ্য লোকও পরিস্থিতির কারণে অনেক কিছুই করতে পারে না। পরিস্থিতি অনুকূল হলে কম যোগ্য লোকও পারে। এগুলোর ইতিহাস পড়লে আমরা জানতে পারি যে যারা কোনো বড় কিছু অর্জন করছে তাদের কি কি যোগ্যতা ছিল এবং তাদের সময়ের পরিস্থিতিটা কেমন ছিল। কোন পরিস্থিতিতে তারা সেসব করতে পেরেছিল।

তেমনিভাবে আবার মানুষের ব্যর্থতাগুলো জানা যায়। ব্যক্তির দোষের কারণে ইতিহাসে কি কি জিনিস ফেল করছে আবার পরিস্থিতির কারণে কারা কারা ফেল করেছে সেগুলো জানা যায়। কাজেই ইতিহাস একটা বড় শিক্ষক। কোনো ব্যক্তির যেসব বিষয় অবশ্যই পড়তে হবে তার মধ্যে একটা হচ্ছে সাহিত্য আর একটা হচ্ছে ইতিহাস। আরো অনেক কিছু আছে যেটা পড়তেই হবে। সেটা আমি এই স্টেজে বললাম না। কিন্তু এই দুইটা পড়তে হবে। সাহিত্য জীবনের দর্পন। জীবনকে জানা যায়। একটা সমাজ কেমন ছিল তা জানা যায়। কোন সমাজটা কেমন তা জানা যায়। যেমন, এটা মনে করা ঠিক হবে না যে শরৎচন্দ্র পড়লে আমি খালি উপন্যাস পড়লাম। তা না, আমি ভিন্ন সমাজকেও বুঝলাম। ওই সময়ের হিন্দু সমাজের দ্বন্দ্বগুলোও বুঝলাম। তৎকালীন হিন্দু সমাজকে জানলাম। একই কথা সত্য সবার ক্ষেত্রে। সেক্সপিয়ার পড়লে আমরা জানতে পারি ওই সময়ের সাহিত্যের উপজীব্য কি ছিল? সেই সমাজটা কেমন ছিল? সেখানে বড় লোকেরা কেমন ছিল? সাধারণ মানুষরা কেমন ছিল? কি কি ধরনের প্রশ্ন তাদের সামনে ছিল?

তেমনি ইতিহাসও খুবই বড় শিক্ষক। আমাদের ইতিহাস ও সাহিত্য এই দুইটা লাগবে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের ব্যাপকভাবে এই দুইটার চর্চাই কমে গেছে। ধর্মের পড়াশুনা নাই। ধর্মকে তো ফিলোসফিই বলা যায়। একদিকে ফিলোসফি আকের দিকে ধর্ম নিজে একটা ফিলোসফি। এটাও আবার মানুষ পড়ছে না। সাহিত্য এবং ইতিহাসও কম পড়ছে আগের তুলনায়। তারা পড়ছে বিজনেস। বিজনেস মানে কি করে একাউন্টিং হিসাব করতে হবে? কি করে প্রোডাক্ট তৈরি করতে হবে? কি করে এগুলো বিক্রি করতে হবে? এগুলো তারা শিখছে। আর অবশ্যই সায়েন্স শিখছে যে সায়েন্সের মাধ্যমে টেকনোলজি তৈরি কর যাবে। যে সায়েন্সের মাধ্যমে বিশ্বের ন্যাচারের অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে যে এগুলো কেন হয় সেগুলো জানা যাবে। সূত্র বের করা যায়, কারণগুলো জানা যায়। কিন্তু তারপরেও এই সায়ন্স আর বিজনেস পড়ে মানুষ হওয়া যায় না। এ দ্বারা রোবট হওয়া যায়। বর্তমানে বিশ্ব অধিকাংশ মানুষ কিন্তু কম বেশি রোবট। হতে পারে ব্যতিক্রম এখনো আছে এশিয়ার কিছু কিছু দেশে। কিংবা যদি বলি মুসলিম ওয়ার্ল্ডের, আফ্রিকার কিছু কিছু দেশ এখনো তারা রোবট হয়নি। কিন্তু বাকি বিশ্ব রোবট হয়ে গেছে। ইউরোপ রোবট হয়ে গেছে। আমেরকি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া রোবট হয়ে গেছে। এই হচ্ছে অবস্থা। আমরা তো রোবট চাই না। যদি রোবট না চাই তাহলে আমাদের ফিলোসফি বা ধর্ম পড়তে হবে। সাহিত্য পড়তে হবে। ইতিহাস পড়তে হবে।

ইতিহাস ডিসটরশন করা যায় না। ইতিহাসের উপর কোনো যোগ বিযোগ করা যায় না। ইতিহাস হচ্ছে যা ঘটেছে এবং কারা ঘটিয়েছে এদের কথা। কি ঘটেছিল তার কাহিনী। এটা সাহিত্য নয়। এখানে গল্প বানাবার কোনো অবকাশ নাই। ইতিহাস আর সাহিত্য এক জিনিস নয়। ইতিহাস গল্প করা যাবে না। ইতিহাস মাস্ট বি ফ্যাক্টচুয়াল। এখানে আমাদের পছন্দ মতো বাড়িয়ে দিলাম বা কমিয়ে দিলাম এগুলো চলবে না। ইতিহাস হলো একটা এলাকার ইতিহাস। ইতিহাস আফটার অল মানুষ নিয়ে ডিল করছে। একটরসরা ডিল করছে যে একটরসরা এটা ঘটিয়েছে। ঐ একটরসরা তো ঐতিহ্য ছিল। যারা একটরস ছিলেন তাদের তো একটা ঐতিহ্য ছিল। যেমন নেপলিয়ন। সে ঐতিহ্য তো ইতিহাসে এসে গেছে। নেপলিয়নের সঙ্গে নেপলিয়নের ঐতিহ্য আসছে। নাস্তিকের সাথে নাস্তিকের ঐতিহ্য আসছে। একজন ধর্ম বিশ্বাসী লোকের সাথে তারও ঐতিহ্য আসছে। সুতরাং ইতিহাস মানে যদি একটরসের কাহিনী হয় তাহলে এর সঙ্গে একটরসদের যে ঐতিহ্য তার যে ব্যাকগ্রাউন্ড, যার মাধ্যমে সে লেখাপড়া করেছে, যে ধর্মের পরিবেশে সে মানুষ হয়েছে অথবা যে কালচারে সে মানুষ হয়েছে সেগুলো সরাসরি নয়ত পরোক্ষভাবে আসছে। আমি সরাসরি বলতে পারব না যে এগুলো ইতিহাসের সরাসরি অংশ। তবে এগুলোর আলাদা একটা ইতিহাস হতে পারে। যেমন আজকাল আমরা বলি ইতিহাস আবার শ্রমিক ইতিহাস্র। আমরা আলাদা করে পড়তে পারি হি্িস্ট্র অব উইমেন। তেমনি ভাবে হিস্ট্রি অব কালচার বলতে পারি। হিস্ট্রি অব ট্রাডিশন, ঐতিহ্য পড়তে পারি। সেটা অন্য বিষয়।

কিন্তু মূল ইতিহাস বলতে যেটা বোঝা যায় তা রাজনৈতিক ইতিহাসকে বলা হয়। সেটা হচ্ছে কিভাবে বিভিন্ন সাম্রাজ্য হলো, রাষ্ট্র হলো। কি কি যুদ্ধ হলো, কারা এর একটরস। ইতিহাস বলতে আমরা এটা বুঝি। কিন্তু ইতিহাসকে যদি আমরা খুবই বৃহৎ অর্থে নেই তাহলে এর মধ্যে সব কিছু এসে যাবে। যেমন সাহিত্যের ইতিহাস বলে আমরা সবটা সাহিত্যে নিয়ে নিলাম। ঐতিহ্যের ইতিহাস বলে আমরা ঐতিহ্যের ইতিহাস নিলাম। গানের ইতিহাস বলে সব গানের আলোচনা শুরু করলাম। সেই দিক থেকে যদি দেখা হয় তাহলে ইতিহাস আর জীবন, ইতিহাস আর ঐতিহ্য, ইতিহাস আর সাহিত্য সব এক হয়ে যাবে। ইতিহাস আর ধর্ম এক হয়ে যাবে। কিন্তু সেটা করা বোধহয় ঠিক হবে না। মূল ইতিহাস হলো রাজনৈতিক (পলিটিক্যাল) ইতিহাস। আর ঐগুলোও ইতিহাস কিন্তু মার্জিনাল। ইতিহাসের মূল অংশ হচ্ছে রাজনৈতিক। আমি এটাও বলব প্রত্যেকটা আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ইতিহাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর এটাকে আমরা বলছি ইতিহাস। একটাকে কালচার বলছি। কিন্তু কালচার বললে তো সেটা ছোট হচ্ছে না। ইতিহাস বলা মানে এই নয় যে কালচার ছোট। বা কালচার বলা মানে এই নয় যে কালচার বড় ইতিহাস ছোট। ইতিহাসের জায়গায় ইতিহাস। কালচারের জায়গায় কালচার। সাহিত্যের জায়গায় সাহিত্য। ধর্মের জায়গায় ধর্ম। এই অর্থে কোনোটাই ছোট হচ্ছে না। প্রত্যেকের আলাদা একটা ক্ষেত্র আছে। আবার একটা মিটিং পয়েন্টও আছে। একটা আরেকটাকে ওভারল্যাপ করতে পারে। ঢুকতে পারে। ইনক্লুড করতে পারে। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাসের কথা বলি বর্তমানে যে ইতিহাস লেখা হয়েছে, যেমন যদি বরি উপমাহাদেশের ইতিহাস তাহলে আমরা কি দিয়ে শুরু করব? সে কি কি করেছিল তা আসবে বা সে কোন ধর্মের লোক ছিল সেটা আসবে। সে যদি কোনো মহৎ কর্ম করে থাকে সেটা এসে যায়। শাহজাহানের কথা বলতে গেলে তাজমহলের কথা বাদ যাবে না। কিন্তু মূলত এটা রাজনৈতিক ইতিহাস। এই ইতিহাসের মধ্যে তাদের জীবনের অনেক কিছু চলে আসবে। তারা যে সাহিত্য করছে সে সাহিত্য এসে যাবে এখানে। যেমন আকবরের সঙ্গে তার দরবারে যারা ছিলেন সেগুলোর উল্লেখ চলে আসবে। আকবর নামা লিখেছেন আবুল ফজল তার কথা চলে আসবে। তবুও আমি বলব রাজনৈতিক ইতিহাসের ভিতর যদি আমরা আলাদা বিভক্তি না করি তাহলে এর মধ্যে সব কিছু মিশ্রিত হয়ে যাবে। এক হয়ে যাবে। তাহলে তো আর ভিন্নতা থাকবে না। ভিন্ন করে স্টাডি করার অববাশ থাকবে না তার।

আমার মনে হচ্ছে, আমাদের বর্তমান শিক্ষার একটা ব্যর্থতা এখানে সেকুলারিজম থেকে অনেক কিছু আসছে। রোবট হচ্ছে আধুনিক সভ্যতার কারণে। আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্তি হচ্ছে সেকুলারিজম। যেটা এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টের ফল। এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্টেরর দুটি কথা ছিল। একটা ছিল খোদায়ী কোনো ব্যাপারে আমরা জড়িত না। এর সব হচ্ছে বৈশ্বিক ব্যাপার। আমরা সব করব। আরেকটা কথা ছিল তাদের রেশনালিজম। সব কিছু য্ুিক্তর উপর। এখানে ঐশ্বরিক কোনো ব্যাপার নাই। রাষ্ট্রের সঙ্গে এগুলোর কোনো যোগাযোগ নাই। এ ধারণা থেকেই এক সময় সেকুলারিজম শব্দটা পপুলার হয়। এর ফলেই ক্রমে ক্রমে মানুষের শিক্ষা থেকে ধর্ম বাদ পড়ে গেল। বিশেষ করে পশ্চিমে এটা বাদ পড়ে যায় এবং মোরালিটির গুরুত্ব কমে যায়। এর ফলেই মানুষ ধর্মের গুরুত্ব কমে গেল বা চলে গেল। ফলে আর ধর্মীয় স্টাডির গুরুত্ব রইল না।

পরবর্তীতে আরো দেখা গেল তারা এই স্বার্থপরতা মধ্যে বলতে লাগল, শ্লোগান দিল টাইম ইজ মানি। তার মানে সময় অন্য কোনো কাজে নষ্ট করা যাবে না। মানির কাজে ব্যবহার করতে হবে। যা দিতে হবে মানির জন্য দিতে হবে। তাই যদি হয় তাহলে আমাকে এমন করতে হবে যে ব্যবসাটাকে শিখতে হবে বেশি করে। যা অর্থ দেয় তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেটা করতে গিয়েই মানুষ বিজনেস সায়েন্সে চলে গেল। পিওর সায়েন্স, টেকনোলোজির সাইডে ছিল কিছুটা। কোনোটাই খারাপ না। যদি সব কিছু মিলে হতো। ধর্ম, নৈতিকতাকে সঙ্গে নিয়ে যদি করা হতো। কিন্তু বাদ দেয়ার কারণে এগুলো একেবারে একপেশে হয়ে গেল। একতরফা একমুখী হয়ে গেল। একমুখী হওয়ার কারণেই মানুষ শেষ পর্যন্ত রোবট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ছেলে মেয়েরাও। আমি যখন ইয়ং ছেলেমেয়েদের দেখি, মনে হয় না যে তাদের জীবনে কোনো উচ্চ লক্ষ্য আছে। তাদের সামনে লক্ষ্য হচ্ছে একটা সুন্দর মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। একটা সুন্দর ছেলেকে বিয়ে করতে হবে। ঘুরে বেড়াতে হবে, মজা করতে হবে। তারা মজা করাই বলে। খাও দাও, ভোগটোগ করে মরে যাও। এর বেশি কোনো লক্ষ্য প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থাও দিচ্ছে না। সায়েন্সে, বিজনেসে কোথাও নাই হায়ার মোরাল কোর্স। এটা একমাত্র আছে রিলিজিয়ন অথবা এথিকসে। আর ইতিহাসে কিছু পাওয়া যায়। সাহিত্যে পাওয়া যায়। কাজেই রোবট এই কারণে হয়ে গেছে এবং হচ্ছে।

যদি এর থেকে ফিরে আসতে হয় আমার মনে হয় ধর্মেই ফিরে আসতে হবে। এটা বলতে আমি এই বোঝাচ্ছি না যে ধর্ম বলতে ইসলাম সবখানেই। আমি অবশ্যই ইসলাম চাই। তারপরও আমি বাস্তববাদী বলেই মনে করি যেখানে হিন্দু ধর্ম ডমিনেন্ট সেখানে হিন্দু ধর্মেই ফিরে আসতে হবে। বৌদ্ধদের বৌদ্ধ ধর্মের দিকেই ফিরে আসতে হবে। খৃস্টানদের খৃস্টান ধর্মের দিকে ফিরে আসতে হবে। কেননা আমি কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারব না। আমি যদি পরিবর্তন চাই তাহলে সবখানেই ধর্মে ফিরে আসতে হবে। কেননা আমরা মুসলিম বিশ্বে করলাম কিছুটা কিন্তু আমরা তো বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে পারব না। টিকতেও হয়ত বা পারব না। এই জন্য বিশ্বব্যাপী এটা দরকার। একটা আন্দোলন দরকার ধর্মে ফিরে যাওয়ার। খৃস্টানিটির মধ্যে, হিন্দুদের যদি এরকম উদ্যোগ থাকে আমি এটাকে স্বাগত জানাই। বিজেপির মতো হওয়া উচিত না যেখানে এন্টি মুসলিম একটা পার্ট আছে। বরং এরকম হতে হবে যে হিন্দু ধর্মের প্রাকটিস তারা পুরা করবে। নৈতিক মূল্যবোধ পুরা নেবে, আইন থাকলে তাও নেবে। কিন্তু অন্য ধর্মের লোকদের তারা হিউম্যান রাইট দেবে। ইসলামের ক্ষেত্রে একই কথা। এরকম একটা জিনিস সম্ভব। আমার মনে হয় পোপ বর্তমানে যে সব কথাবার্তা বলছেন তা এরকমই। ব্যাক টু ফ্যামিলি ভ্যালুস, রিজেক্ট সেকুলারিজম এরকম কথাই বলছেন তিনি। চার্চ অব ক্যান্টারবারি তিনিও একথাই বলছেন। যেগুলো তারা এখন বলছেন হয়ত বস্তুবাদের, সেকুলারিজমের, নাস্তিকতার প্রভাব তারা বেশি অনুভব করছে।

তার প্রভাব এই রোবটের মতো লোকগুলোর উপর কতটা পড়বে যদি বেসিক শিক্ষা সংশোধন না করা হয়? হ্যাঁ, তারা পারবেন যদি তাদের দাওয়াতটা খুব বেশি হয়। তাদের সত্যিকার মুভমেন্ট, সেখানে দাওয়াত থাকবে, যেমন আমরা বলি দাওয়াতের কথা। যেমন ইসলামিস্টরা যতই ক্রটিপূর্ণই থাকুক তারা বলে যে আমাদের দাওয়াত দিতে হবে, লোকদের কনভিন্সড করার চেষ্টা করতে হবে। আমরু বিল মারুফ করত হবে। নেহি আনিল মুনকার করতে হবে। খৃস্টান ধর্মের তাৎপর্যও তাই। দাবি তো তাই। ইসলামে বলা আছে আমরু বিল মারুফ কিন্তু খৃস্টান ধর্মে এই মূল কথাটা নাই বলা যাবে না। নিশ্চয়ই ঈসা (আ) এটাই চেয়েছেন যে ধর্মের কথা অন্যদেরকে বল। এটা তো হতে পারে না যে, বলো না। চার্চের এ ব্যাপারে অনেক দায়িত্ব। তাদের ভালো লোকদের অনেক ডিউটি আছে এটা করার।

গোটা বিশ্বেই একটা ব্যাক টু রিলিজিয়ন, ব্যাক টু মোরালিটি, ব্যাক টু এথিকস এটা হতে হবে। না হলে মানুষের মুক্তি নাই। মানুষ একেবারেই বর্বর হয়ে যাচ্ছে, স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। চিট, বাটপার, লোভী হয়ে যাচ্ছে। অত্যাচারী হয়ে যাচ্ছে। জাতির উপর জাতির অত্যাচার, ব্যক্তির উপর ব্যক্তির অত্যাচার, শ্রেণীর উপর শ্রেণীর অত্যাচার। সব সম্পদই একমাত্র গিয়ে আমেরিকারÑএটা কি করে হলো? এটা তো অত্যাচারেরই অন্য নাম। কাজেই অনেক মৌলিক প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত।

আমাদের দেশে ইতিহাস চর্চা হচ্ছে না তা বলব না। হচ্ছেও বলব না। হচ্ছে এই অর্থে বলব যে, আমরা যে ইতিহাস পড়ি, উপমহাদেশের যে ইতিহাস পড়ি সেটা মোর অর লেস কিছু ফেয়ার রাইটার আছেন যারা লিখছেন, কিছু রাইটার হয়ত বা বিকৃত করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ লেখকই ভালো লিখেছেন। কিন্তু আমাদের ইতিহাসের কোথাও কোথাও যে সব বিকৃতি চলে আসছে সে সব দূর করতে হবে। একদল সাহসী লোককে এটা করতে হবে। বাংলাদেশের পরে জন্ম নিয়েছে এমন লোক তা করতে পারবে, আগের লোকেরা পারবে না। তাদেরকে এটা করতে হবে।

ইতিহাস তো আপন গতিতে চলেÑএটা একটা কথার কথা। এটা একটা বক্তব্য। যেমন টাইম ইজ মানি। এটাও একটা বক্তব্য। এই বক্তব্য কি সঠিক? আমরা জানি টাইম ইজ নট অনলি ফর মানি। টাইম ইজ অলসো ফর হেল্পিং আদারস। টাইম ইজ অলসো ফর ইবাদত। অলসো ফর সার্ভিং প্যারেন্টস। তেমনিভাবে অনেক শ্লোগান আছে যার সত্যিকার ভিত্তি নাই। ইতিহাস আপন গতিতে চলে এটা এই অর্থে ঠিক যে কোনো এক ব্যক্তি ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইতিহাসে কোটি কোটি একটরস, লোক জড়িত। সুতরাং আপন গতিতে চলে মানে একটা ছোট গোষ্ঠী এটা বদলাতে পারবে না ঠিক। রেকডিং ভুল হতে পারে কিন্তু কেউ না কেউ সেই রেকর্ডিং চ্যালেঞ্জ করবে। যেমন আওরঙ্গজেব নিয়ে অনেক কথা আছে। কিন্তু পরবর্তীতে হিন্দু ঐতিহাসিকরাই বলছেন এগুলোর অনেক কিছুই মিথ্যা। তেমনিভাবে আমি মনে করি ইতিহাস নিজের গতিতে চলে এই অর্থে যে কোনো এক ব্যক্তি এটাকে বদলাতে পারে না। কারোর হাতে এটার নিয়ন্ত্রণ না। একটা পার্টিও এটা নিয়ন্ত্রণ করে না। একটা পার্টি এটা বদলাতে পারবে না। যতই করা হোক সে একটা গতিতে ফিরে আসবে। কোটি লোকের যে একটা গতি, কোটি লোকের যে একটা মিলিত চিন্তা এটা রিফলেকশন আলটিমেটলি করবেই।

আমার মনে হয় ইতিহাস আমাদের পড়ানো হচ্ছ না বোধ হয়। মনে হচ্ছে এসএসসিতেও ইতিহাস খুব ভালো করে নেই। তাদের বোধহয় সীমাবদ্ধতাও আছে, এত সাবজেক্ট কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়াবেÑএসব রেেয়ছে। কিন্তু তার মধ্যেও আমি ঠিক কি বলব জানি না, কিন্তু ইতিহাস পড়তে হবে এটা আমি জানি। কিছু হলেও পড়তে হবে। আর উপরের দিকে ইতিহাস থাকতে হবে। আমার মনে হয় গ্রাজুয়েশন কোর্সে যে সাবজেক্টই পড়–ক একটা অংশ ইতিহাসের উপর পড়া উচিত। যেমন আমি শুনেছি হার্ভার্ডে যে যে সাবজেক্টেই পড়–ক ইতিহাস যেহেতু বেসিক একটা নলেজ এটা পড়তে হবে। এখন আমাদের কোনো কোর্স যদি একশ ত্রিশ ক্রেডিটের হয় তার মধ্যে আমরা যা পড়াচ্ছি সবটাই পড়ালাম। কিন্তু অর্ধেক অর্থাৎ ৬৫ ক্রেডিট এ পড়ালাম। বাকিটা আমরা দশটা সাবজেক্ট পড়ালাম। তাহলে সেটা একটা ব্রডার পারসেপশন হবে। এই জিনিসটা করতে হবে। কিভাবে করতে হবে, কবে হবে জানি না। কিন্তু করতে হবে। ইতিহাসকে উপেক্ষা করা যাবে না। সাহিত্য উপেক্ষা করা যাবে না। সাহিত্যও কিছু না কিছু পড়তে হবে।

ঐতিহাসিকভাবেই মানতে হবে কালচারের ভিত্তি ধর্মই ছিল। এটা না মানা মানে বাড়াবাড়ি। হিন্দুদের ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্ম প্রাথমিকভাবে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম আর অন্যরা মাইনর গ্রুপ। খৃস্টানরা তো অনেক পরে এসেছে। বৌদ্ধ ধর্মই বৌদ্ধদের কালচারের ভিত্তি ছিল। পরবর্তীকালে একটা কালচার এসেছে পশ্চিমা থেকে। সেটা সবাইকে কমবেশি প্রভাবিত করেছে। তা ড্রেস প্যাটার্নে, ভাষায় বিনোদনে প্রভাব পড়েছে। খেলাধুলায় প্রভাব রাখছে। চিন্তুায় হয়ত বা প্রভাব রাখছে। যেটুকু ভালো এটুকু হয়ত বা বাদ দেয়া যাবে না। কিন্তু যা মন্দ তা গ্রহণ করাই উচিত না। নেয়াও উচিত না। বজায় রাখাও উচিত না।

সুতরাং আমাদের বর্তমানে কালচারে একটা মিকচার হচ্ছে। দেশে একটা মিক্সড কালচার করার চেষ্টা করা হচ্ছে যেন এখানে হিন্দু ধর্ম ইসলাম মিশে যায়। এরকম একটা ব্যাপার বা এর কাছাকাছি যেন চলে আসে ধর্ম হিসেবে। এখানে মঙ্গল প্রদীপ দিয়ে শুরু করা হবে। আর্ট কলেজ বেসিক্যালি হিন্দু থট ভিত্তিক হবে বা হিন্দু প্রাকটিস ভিত্তিক হবে। এই রকম। কিন্তু আমি মনে করি মানুষের বেসিক পরিচয় হচ্ছে ধর্ম। কোরআনও তা বলে। আল্লাহপাক সূরা বাকারাতে বলেছেন, লা তামুতুন্না ইল্লা ওয়া আনতুম মুসলিমুনÑযে তোমরা মরো না যতক্ষণ না তোমরা মুসলিম হয়েছ। অবাক লাগে যে আল্লাহতায়ালা বললেন না যে, আমেরিকান বা পাঞ্জাবী বা ভারতীয় হয়ে মোরো না। বা বাঙালী হয়ে মোরো না। এটা প্রমাণ করে রাব্বুল আলামীনের কাছে মূল পরিচয় হচ্ছে মুসলিম পরিচয়। অমুসলিমের ক্ষেত্রেও তাই। হিন্দু ধর্ম একজন হিন্দুর আসল পরিচয়। এই এই পরিচয়ের ভিত্তিতে যদি বাংলাদেশে দুইটা কালচার থাকে তাতে সমস্যা নাই। এর রাষ্ট্রে কয়েকটা কালচার থাকতেই পারে। ভারত এক রাষ্ট্রে অন্তত বিশটা ভাষা আছে। কি সমস্যা এতে? যে ভাষা বেশি চলে সেটা রাষ্ট্রভাষা হলো। তেমনি আমার মনে হয় এটা এখানকার লোকজন মানতে পারছে না। ইসলাম যারা মানে না মুসলিম আইডেন্টিটির মধ্যে যে কোনোরকম আপস নাই এটা তারা বুঝতে পারে না। আমার অন্য আইডেন্টিটি আছে। আমি একই সঙ্গে কিশোরগঞ্জের মানুষ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ। একই সঙ্গে বাংলাভাষী। এটা মানতে পারছে না এরা। এখানে তারা মিক্সড আপ করতে চাচ্ছে। অথচ এটা অযথা। যেমন একটা দেশে সবাই ডাক্তার হওয়ার দরাকার দেনই। সবাই ডাক্তার না হলে ঐক্য হবে না বা সবাই ইঞ্জিনিয়ার না হলে ঐক্য হবে নাÑএটা ঠিক না। তেমনি সবাই মুসলিম হতেই হবে এটাও কথা না। কাজেই ভিন্ন কালচারকে মেনে নেয়াই ছিল ভালো। কিন্তু এটা একদল সেকুলার ইচ্ছা করে ইসলামকে দুর্বল করার জন্য বাঙালী কালচার এবং বাঙালীত্বকে বড় করে দেখাচ্ছে। বাঙ্গালীত্বও একটা জিনিস। কিন্তু এটা মৌলিক না। বিশ্বাস যেমন মৌলিক, এক আল্লাহর বিশ্বাস, আখেরাতে বিশ্বাস যেমন মৌলিক কোন ভাষায় কথা বললাম এটা অতটা মৌলিক না। বিশ্বাসই মানুষের কার্যকে, সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেই বিশ্বাস আসছে ধর্ম থেকে।

যে মূল্যবোধ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা আসছে ধর্ম থেকে। আমি কি মাছ খেলাম এটা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। আমি এদেশের তৈরি সবজি খেলাম এটা আমার ওয়ে জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। এটা ভুল ধারণা। কিন্তু এটাকেই কিছু লোক স্টাবলিস্ট করতে চাচ্ছে। এই বিষয়টাকে মৌলিখভাবে চ্যালেঞ্জ করা দরকার। এটা করছে মূলত তারা যারা ইসলামকে সহ্য করতে পারছে না। এটা করছে যারা নাস্তিক বা নাস্তিকের কাছাকাছি তারা। যারা লেফটিস্ট, যারা না বুঝে মনে করছে আমাদের আর কিছু করার নাই, এখন ইসলাম বিরোধীতা আমার একমাত্র কাজ। যেহেতু আমাদের কিছু করার নাই আমরা কি প্রতিষ্ঠা করব? সোসালিজম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। কমিউনিজম সম্ভব না। তাহলে আমরা একটা কাজ নিলাম ইসলাম বিরোধীতা করার। তাদের যে ব্যর্থতা সেটা তো ঠিক, কিন্তু ব্যর্থতা তারা মানতে পারছে না। তাদের উচিত ছিল ইসলামাকে বিচার করা। বিচার করে যদি এটা গ্রহণযোগ্য হয় গ্রহণ করা। কিন্তু সেই বিচার তারা করতে পারছে না। অন্ধ বিদ্বেষ দ্বারা তারা পরিচালিত। সেই পরাজয় তারা মানতে পারছে না।

ইসলাম বলে মুনকার গ্রহণ করো না। শিরক আর ফায়েশা গ্রহণ করো না। এই তিনটা জিনিসকে বর্জন না করে করে আমরা অন্য কিছু নিতেও পারি সাবধানতার সঙ্গে। যদিও নেয়া কোনো বিজয়ী জাতির পরিচয় না। বিজয় জাতি নিজে থেকে ইনোভেট করে। ভারত থেকে যে কালচারটা আসছে তার অর্ধেকটা হচ্ছে শিরক ভিত্তিক আর অর্ধেকটা হচ্ছে ওয়েস্টার্ন, বোম্বে হয়ে আসছে। এই দুইটা আমাদের মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অবস্থাটা এরকম যে ওরা জিততে পারছে না। কিন্তু আমরাও জিততে পারছি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে আমি বিশ্বব্যাপী যে ফেনমেনা দেখছি তা হলো ইসলামের প্রচার প্রসার বাড়ছে। এমনকি বাংলাদেশেও আমি দেখছি ইসলামের প্রচার প্রসার বাড়ছে। এটা আলটিমেটলি উইন করে যাবে। লেফটের ভিত্তিটা দুর্বল। পজেটিভ কোনো ভিত্তি নাই। লা ইলাহা শুধু চলে না ইল্লাল্লাহ ছাড়া। ওদের শুধু লা ইলাহা আছে, লা ইসলাম আছে। কিন্তু তার পরিবর্তে কিছু নাই। সেকুলারিজম কোনো পজেটিভ আইডিয়া নয়। এটা বলে ধর্ম থাকবে না রাষ্ট্রে। ডেমোক্রেসি ইসলামেও আছে। স্টাইলে সামান্য কিছু বেশ কম হতে পারে। আমার মনে হয় এ ক্ষেত্রে জিতে যাবে ইসলামিস্টরা যদি তারা অনেকটা তিউনিসিয়া মিসরের মতো বুদ্ধিমান হয়।

সময় একটা বিষয় চলে যায়। আমাদের জীবনে মনে হয় যে অনেক সময় চলে গেছে। রাসূল (স) এর পরে ইতিহাসে চৌদ্দশ বছর চলে গেছে। তাদের সাকসে এটুকু সাতচল্লিশের পরে এখানে প্রধানত মুসলিম আইডেন্টিটি ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে একটা তীব্র অন্ধ জাতীয়তাবাদ চলে আসল। সেটা আমাদের মুসলিমত্ব কমিয়ে দিল। কমিউনিস্ট দের সফলতা হচ্ছে এখানে যে তারা আমাদের মুসলিমত্ব ভুলাতে পারছে। কমাতে পারছে। তবে এখন তাদের এই প্রচেষ্টা থমকে গেছে এ কারণে যে ইসলামিস্টরা আবার কমবেশি জেগে উঠেছে। তাদের মধ্যে একটা ছোট হলেও ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীই ইন্টারন্যাশনাল ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপের প্রভাব পড়ছে।

— শাহ আবদুল হান্নান
http://www.sonarbangladesh.com/articles/ShahAbulHannan

Advertisements
No comments yet

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: