Skip to content

আনওয়ার আল আওলাকি : এক মৃত্যুহীন প্রাণ

ফেব্রুয়ারি 3, 2012

লিখেছেন: আবু সামীহা সিরাজুল ইসলাম
awlaki

আল-আওলাক্বী নামটার সাথে আমার পরিচিতি ঘটে ২০০২ সালে। আল-মদীনাহ স্কুলে সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্র মুয়াজ। তাঁর বংশীয় নামের বানানটা রোমান [ইংরেজী] বর্ণমালায় এমন ভাবে লিখা ছিল যে আমি পড়তে পারছিলামনা। যেভাবে বানান করা হয়েছিল তাতে একরকম উচ্চারণ হচ্ছিল যা আমি উচ্চারণ করলে সে শুদ্ধ করে দিয়ে বলল ওটা আল-আওলাক্বী। তখন থেকেই আল-আওলাক্বী গোত্রের সাথে পরিচয়।

২০০৫ সালে ভিডিওসহ ৫ম প্রজন্মের আইপড বাজারে আসলে আমি ৩০ গিগার একটা কিনলাম। উদ্দেশ্য হল কাজে যেতে আসতে কুরআন তিলাওয়াত শুনা, যাতে এর একটা অংশ মুখস্ত করা যায়। কিন্তু ৩০ গিগাবাইট অনেক বেশী বড় মেমোরী পুরো কুরআনের জন্য। তাই বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামী বক্তৃতার অডিও যোগ করা শুরু করলাম। এর মধ্যে রসূলুল্লাহর (সঃ) সীরাতের উপর আলোচনার ফ্রী অডিও খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেলাম ইসলামিক ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্কের [ibn.net] ওয়েবসাইটে বিরাট একটা কালেকশন। আর সেখানেই পেলাম শায়খ আনওয়ার আল-আওলাক্বীর সীরাতের উপর ধারাবাহিক আলোচনা।

আওলাক্বী নামটা আগেই মাথায় ছিল স্কুলের ছাত্র মুয়াজ়ের নাম থেকে। স্বাভাবিকভাবেই একটু আকর্ষণ বোধ হওয়ায় শুনতে শুরু করলাম। সেই নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে থাকতেই গোলাম মুস্তফার “বিশ্বনবী” পড়া শেষ করেছিলাম। এরপর ইবন হিশাম, রসূলুল্লাহর বিল্পবী জীবন, সীরাতে সরওয়ারে আলম, মানবতার বন্ধু, রাহীকুল মাখতুম, রসূল মুহাম্মাদ (সঃ), মার্টিন লিংগসের “Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources” সহ আরো অনেকগুলো বাংলা-ইংরেজী মিলিয়ে ছোট বড় সীরাতের কিতাব পড়া হয়ে গেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ ক্রেডিটের “Biography of the Prophet” কোর্সও নিয়েছি ড. ইসরার আহমদ খানের সাথে। সে কোর্সেতো ড. খানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিতও করে ফেলেছিলাম আমি। অথচ যখন আল-আওলাক্বীর আলোচনা শুনতে শুরু করলাম তখন মনে হল সীরাতের ব্যাপারে আমার জ্ঞান এখনো প্রাথমিক স্তরের। সুবহানাল্লাহ! IBN এর ওয়েবসাইটে শুধু মক্কী জীবনের উপর তাঁর আলোচনাগুলো ছিল। সবগুলো নামিয়ে নিয়ে শুনে ফেললাম নিজের অবসর সময়গুলোতে।

তারপর কিনে ফেললাম তাঁর মাদানী জীবনের উপর আলোচনার সিডি সেট। এরপর আবূবকর (রাঃ) ও উমরের (রাঃ) জীবনীর উপর তাঁর আলোচনার সিডিগুলোও সংগ্রহ করে ফেললাম। তাঁর এই সব আলোচনাগুলো ছিল আমার জন্য জ্ঞানের নতুন দিক উন্মোচনকারী। আল্লাহ রহম করুন শায়খ আওলাক্বীর উপর।

আনওয়ার আল-আওলাক্বী কোন গতানুগতিক মাওলানা ছিলেননা। আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে ১৯৭১ সালে জন্মেছিলেন শিশু “আনওয়ার বিন নাসের বিন আব্দুল্লাহ আল-আওলাক্বী।” সাত বছর বয়সে তাঁর পিতার সাথে ইয়েমেন চলে যান আনওয়ার। পরে কলোরাডো ফিরে এসে কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক হন। তারপরে সান-দিয়েগো স্টেইট ইউনিভার্সিটি থেকে “এডুকেশনাল লীডারশিপ” এ এম,এ, পাস করেন এবং আমেরিকা ছাড়ার আগে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে “হিউম্যান রিসোর্স ডিভলপমেন্ট”এ পি-এইচ,ডি, করছিলেন।

ওয়াশিংটনে থাকা অবস্থায় তিনি ভার্জিনিয়ার ফলস-চার্চে অবস্থিত “দারুল হিজরাহ” মসজিদের ইমাম ছিলেন। এখানেই তিনি রসূলুল্লাহর (সঃ) মক্কী জীবনের উপর ধারাবাহিক আলোচনাগুলো পেশ করেছিলেন। এরপর তিনি ইউ,কে, তে একটা সময় কাটান। তাঁর আলোচনাগুলোতে দীনের নির্ভেজাল রূপটাকেই তিনি তুলে ধরেছিলেন। কাফিরদের সাথে মু’মিনদের সম্পর্কের স্বরূপ কোন হীনমন্যতা ছাড়াই সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। আদর্শের ব্যাপারে যে আপোসকামিতা আমরা দেখে এসেছি বিগত শতকের ৯০ এর দশক থেকে তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে নির্ভেজাল ইসলামের কথাই বলেছেন শায়খ আওলাক্বী। তাঁর আরবী ও ইংরেজীতে দক্ষতা ইসলামের পশ্চিমা শত্রুদেরকে আতঙ্কিত করে তোলে। কোন ধরণের ক্ষমাপ্রার্থনার (apologetic approach) পরিবর্তে পশ্চিমাদের জ়ুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। বন্ধু ও শত্রু নির্বাচনে যাতে মু’মিনরা কখনো ভুল না করে সে ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন তিনি; আর সে সচেতনতা যাতে মু’মিনদের সবার মধ্যে সৃষ্টি হয় সে বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতেন তিনি তাঁর বক্তৃতায়। আর এভাবেই তিনি শত্রু হয়ে গিয়েছিলেন মু’মিনদের শত্রুদের। আর তাই ইয়েমেনের এক সময়কার কৃষি মন্ত্রীর ছেলে ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হবার পরও পশ্চিমাদের স্বার্থের ক্রীড়নক আলী আব্দুল্লাহ সালেহকে দিয়ে ইয়েমেনে শায়খ আওলাক্বীকে গ্রেফতার করায় আমেরিকা। বন্দী করে নির্যাতন চালানো হয় তাঁর উপর।

নিজ দেশের নাগরিকদের বিদেশী সরকারের গোয়েন্দা দিয়ে নির্যাতন করানো আমেরিকার ইতিহাসে সম্ভবত খুব বিরল। কিন্তু শায়খ আওলাক্বীর উপর তাই করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে হিংসাত্মক আচরণের প্রবক্তা তিনি ছিলেননা। তাঁর কোন আলোচনায় এধরণের কোন কথা তিনি বলেননি। তবে ইসলামী জিহাদের ক্ষেত্রে আপোসকামী-শান্তিবাদী-পুষি বিড়াল হওয়াকেও তিনি গ্রহণ করেননি। মুসলমানদের দেশ আক্রান্ত হলে সেখানে ন্যায়সঙ্গত জিহাদকে সন্ত্রাসবাদ আখ্যাদানকে তিনি মেনে নেননি; বরং প্রতিরোধকে মু’মিনদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। হাজার হাজার পাউণ্ড বোমা বর্ষণ করে লাখ লাখ মুসলিমের হত্যার বিপরীতে মুসলিমদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় কিছু কাফির নিহত হওয়াকে তিনি কন্ডেম করতে অস্বীকার করেছেন। উম্মাহর আত্মমর্যাদাবোধকে জাগ্রত করতে এর বিকল্প নেই। মুসলিম শাসকগোষ্ঠির নির্লিপ্ত ভাব ও মুসলিম হত্যায় কাফিরদের সহযোগিতা করাকেও তিনি কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। আর এসব কারণে আল্লাহ ও মু’মিনদের শত্রুরা তাঁকে ইয়েমেনের আলী আব্দুল্লাহ সালেহর কারাগারে পাঠিয়ে নির্যাতনের ব্যবস্থা করে। আর শেষে বারাক হোসেইন ওবামা মার্কিন ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোন নাগরিকের মৃত্যু পরওয়ানায় সই করেন তাঁর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোন অভিযোগ, মামলা বা দণ্ডাদেশ ছাড়াই।

অবশেষে তারা নিজ দেশের একজন নাগরিক যার বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, সন্ত্রাসী হিসেবে কোন কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নেই, এমনকি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে এমন কোন সম্ভাবনাও নেই তাকে হত্যা করেছে আরেকটি দেশের সার্ব্বভৌমত্ব লংঘন করে।সেন্টার ফর কন্সটিটিউশনাল রাইটস এজন্য অবশ্য আমেরিকান সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

আনওয়ার আল-আওলাক্বীর মত মানুষের আর কোন অপরাধ নেই শুধু এক স্বপ্রশংসিত সুমহান স্বত্তার উপর ঈমান আনা ছাড়া এবং মজলুম মুসলমানদের পক্ষে কথা বলা ছাড়া। তাঁর আরো অপরাধ ছিল তিনি নির্ভেজাল ও কোন ধরণের রাখ-ঢাক ছাড়াই ইসলামের পক্ষে কথা বলতেন fluent and idiomatic ইংরেজীতে, যা তাঁর ক্যারিসমেটিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটাত, চমৎকৃত করত তাঁর শ্রোতাদেরকে। পশ্চিমী মুসলিম তরুণরা আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়ে নিজেদের দীনকে শিখছিল, আর ইসলামের জন্য অপরাধবোধ ও ক্ষমাপ্রার্থনার [apologetic approach due to guilty conscience] যে ধরণ কিছু পণ্ডিতরা ব্যক্ত করছিলেন তা থেকে দূরে সরে গিয়ে আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হচ্ছিল। মু’মিনদের প্রতি দরদ ও কাফিরদের প্রতি কঠোরতার অনন্য দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছিল তাঁর আলোচনায়, যা মু’মিন তরুণদেরকে আকৃষ্ট করছিল চুম্বকের মত। আর এ কারণে তাঁর ব্যক্তিত্ব একই সময়ে ভীত করে তুলেছিল আল্লাহ, তাঁর দীন ও মু’মিনদের শত্রুদেরকে।

আমরা তাঁর সম্পর্কে ভাল ছাড়া খারাপ কিছুই জানিনা। ইয়েমেনী জেলে জীবনের একটা অংশ কাটানোর পর এবং আমেরিকানদের নির্বিচারে মুসলিম হত্যা অবলোকন করার পর তিনি কিছুটা রাডিক্যাল হয়ে পড়েছিলেন। শেষ দিকে ওমর ফারূক আব্দুল মুত্তালিব ও ইউ,এস, আর্মি মেজর নিদাল হাসানের ব্যাপারে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সেই আনওয়ার আল-আওলাক্বীর মত মনে হয়নি যাকে আমরা চিনতাম। সেই বক্তব্যগুলো যদি আসলেই তাঁর হয়ে থাকে তবে আমরা সেগুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করি।

আল্লাহ আনওয়ার আল-আওলাক্বীর গোনাহগুলো মাফ করে দিয়ে তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন। তাঁকে তিনি জান্নাত আল-ফিরদাউস দান করুন। আর আমাদেরকেও আল-আওলাক্বীর মত আল-ওয়ালা ওয়াল-বারাআহর সীমা বুঝে তা মেনে চলার তৌফিক্ব দিন।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْ‌تَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّـهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِ‌ينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّـهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ۚ ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّـهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَاللَّـهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

“হে মু’মিনরা! তোমাদের মধ্য থেকে যে নিজের দীন থেকে ফিরে গেল [তার জানা উচিৎ] আল্লাহ শীঘ্রই এমন একদল লোকের উদ্ভব ঘটাবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালবাসবে; যারা মু’মিনদের প্রতি হবে দয়ার্দ্র-বিনম্র আর কাফিরদের প্রতি কঠোর। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে; আর এ ক্ষেত্রে কোন নিন্দুকের নিন্দার কোন পরোয়াই করবেনা। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ; যাকে ইচ্ছে তিনি তা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যদাতা ও মহাজ্ঞানী।” [৫: ৫৪]

* * * * *

এই লেখাটি ০৩ অক্টোবর ২০১১ তারিখে সোনার বাংলাদেশ ব্লগে প্রকাশিত। আলোর পথে কর্তৃক সংগৃহীত।

Advertisements
No comments yet

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: