Skip to content

একটি নিউ ইয়ার এবং কিছু নতুনত্ব

জানুয়ারি 14, 2012

লিখেছেনঃ স্বপ্নচারী আব্দুল্লাহ
rain5

একটা নতুন বছর চলে এলে চারপাশে সাড়া পড়ে যায়। বিশেষ করে কেন যেন ইংরেজি নতুন বছর এলে সবাই অনেক আনন্দিত থাকে, থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন করে আর উইশে উইশে ভরে যায় ফেসবুকের ওয়াল, মেসেজ ইনবক্স, মেইলের ইনবক্স। বন্ধু-ভাই-বোনদের সাথে দেখা হওয়ার পর প্রথমে সালাম দেয়ার আগেই সেদিন “হ্যাপি নিউ ইয়ার” শুনে “টু ইউ ঠু” বা নিজেও “হ্যাপি নিউ ইয়ার” বলা ছাড়া যেন ভদ্রতা হয়না।

আমার কাছে সালাম দেয়াকে উহ্য রেখে এই অযথা তিনটি শব্দ উচ্চারণের কোন অর্থ হয়না। দেখা হলে সালামের কোন বিকল্পই খুঁজে পাইনা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যেন আমরা জমীনের বুকে সালামকে প্রতিষ্ঠা করি। একটা দোয়া এই সালাম — যা ভনিতা নয়, বরং সুন্দর করে ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ করে অপরের জন্য শান্তি বর্ষণের দু’আ করা আমাদের বিশ্বাসের সংস্কৃতি — যে সংস্কৃতি মহান আল্লাহর প্রতি নিজেদের আনুগত্য থেকে উৎসারিত আর প্রবাহিত।

বরাবরের মতন এবারেও নতুন বছর এসেছে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। ২০১২ সাল। একটা ইংরেজি মুভি ছিলো এই নামে। যেটা দেখে অনেকের কিয়ামতের কথা ভেবে অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিলো বলে শুনেছি, দেখেছি। মুভির রেশ কেটে যাওয়ার পরে হয়ত আমাদের অনেকেই সেই কিয়ামতের দিনের কল্পনাকেও ভুলে গেছি। ক’দিন আগে সুযোগ হওয়ায় মুভিটার আংশিক দেখেছিলাম। ভয়াবহতাকে খুব কমই প্রকাশ করতে পেরেছে। আমি কিয়ামতের বর্ণনা পড়েছি আল-কুরআনে, সেই দিনের স্মরণে, ভয়ে আর শংকায় কাঁদতে দেখেছি অনেক সুন্দর মন আর কাজের মানুষদেরকে — যেমন করে কাঁদে শিশুরা, তেমন করে। আমি আমার শক্তপোক্ত গম্ভীর আব্বাজানকে রাতের বেলা তাহাজ্জুদে উঠে কান্নাকাটি করে দু’আ করতে শুনেছি আল্লাহর কাছে নিশ্চিত ফিরে যাবার কথা উচ্চারণ করে, আল্লাহর হিসেব নেয়ার কথা স্মরণ করে — সেই কান্নাও যেন শিশুদের মতন করেই! এই পৃথিবী ধ্বংসের দিনের স্মরণ আমাদের অন্তরকে নরম করে দেয়, নিজেদের ক্ষুদ্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সেই অন্তর তাই মহান আল্লাহর কাছে অনবরত পানাহ চাওয়ার জন্ম উন্মুখ হয়ে যায়।

নিউ ইয়ার এলেই সবসময়ে আমার থার্টি ফার্স্ট নাইটের কথা স্মরণ হয়। পিচ্চি ছিলাম তখন পত্রিকার প্রথম পাতায় বাঁধন নামের এক মেয়ের কাপড় নিয়ে টানাটানির দৃশ্যসমৃদ্ধ ছবি দেখেছিলাম — সেই বিভীষিকা এখনো স্মৃতিকে ধাক্কা দেয়। এরপর থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি জানুয়ারিতেই এরকম নোংরা ঘটনা দেখে আসছি পত্রিকার পাতাগুলোতে। উদ্দাম আনন্দের কারণ আর সীমারেখা — দুয়ের অভাবেই কেউ না কেউ, কোন না কোনভাবে অবশ্যই ইজ্জতকে পথের ধারে ফেলে রেখে আসছে। এই নিউ ইয়ার জিনিসটা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশের সৃষ্টি ছিলো প্রথমে — এটির উদযাপন জিনিসটাও ওদেরই সৃষ্ট। অন্য ধর্মের সৃষ্ট আনন্দ বিনোদনের দিনগুলোকে গ্রহণ করার ব্যাপারে হাদিস-কুরআনের রেফারেন্সে স্কলারগণ বড়দিন-নিউইয়ার পালনকে নিষিদ্ধ বলেছেন। উদ্দাম উন্মাদীয় আনন্দ এবং সর্বোপরি পৃথিবীতে আমরা যার নির্দেশ পালন করতে এসেছি তার দেখানো পথের কথা ভুলে ভ্রষ্ট আর ভুল লোকদের আনন্দকে উদযাপন করার মাঝে "নিস্পাপ আনন্দ আছে মনে করে" যোগ দেয়াটাও আমাদের দ্বীনের শিক্ষা বহির্ভুত। অথচ আমরা কত সহজেই এই নিষিদ্ধ সংস্কৃতিকে ভুলে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে কয়ে ডিজে ডান্স নেচে, কেক কেটে উদযাপন করতে থাকি। অথচ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন ঈদ, দুইটা ঈদ। এই ঈদের নাচ-গানের উদ্দাম আনন্দ না, থাকে আত্মার স্পন্দন, প্রশান্তি, ভালোবাসার ছড়াছড়ি। আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন সাপ্তাহিক ঈদ — জুমুআ’হ এর দিনটা। প্রতিটি জুমু’আর দিনকে উদযাপন করার কথা শিখেছি আমার শিক্ষকদের কাছে। এই দিনটির গুরুত্ব অসাধারণ!! জানলে কেউই মিস করার কথা না! জুমুআ’হ হলো সাপ্তাহিক ঈদের দিন, এদিন দোয়া কবুল হয়। এরকম অনেক কিছু জানার আছে !

আমার কাছে প্রতিটি দিনই নতুন। আমি একটা কাজ করার ব্যাপারটা বেশ অনুভব করি। তা হলো — নতুন করে শুরু করা। আমি একটা উপলক্ষ্য পেলেই নতুন করে শুরু করি সবকিছু। যেমন শুক্রবার থেকে সবগুলো ওয়াক্তের নামায জামাআতের সাথে আদায়ের নিয়াত করি, আর মিথ্যা বলবো না, চোখকে সংযত রাখবো, বাজে কথা বা অনর্থক কথা একবারেই বলবো না, কাজে মনোযোগী হবো, সময় নষ্ট করবো না একদম। এই ‘নতুন করে, নতুন উদ্যমে শুরু করা’ নিয়ে কারো কারো কাছে আমি খোঁটা খেয়েছি। অথচ সেই দুর্মুখেরা কেবল খোঁচা দিয়ে নিজেদের আত্মাকে হয়ত ক্রমাগত নোংরা করতে থাকে। হালকা কষ্ট পেয়ে আমি তাই এটা নিয়ে বড়দের (যাদের দ্বীনের জ্ঞানে বড় হিসেবে দেখেছি) সাথে কথা বলেছি তাদের প্রায় সবাই একমত হয়েছেন যে, সুন্দর করে আর নতুন করে স্বপ্ন দেখা জিনিসটা পজিটিভ। এই নতুন করে শুরু করার জিনিসটা একটা প্রেরণা যোগায়। হতে পারে নতুন ভার্সিটি লাইফ শুরু হচ্ছে, বা নতুন বছরের নতুন ক্লাসে উঠছি, কিংবা নতুন একটা সপ্তাহ শুরু হচ্ছে — এরকম যেকোন উপলক্ষ্যেই মনে করতে চাই যে এই নতুন জিনিসটা পাওয়ার রাহমাত আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন, এই রাহমাত পাওয়ার সুন্দর সময়টার বদৌলতে আমি একদম শুধরে নিবো নিজেকে, হয়ে যাবো যেমন হতে চাই, যেমন হওয়া উচিত।

হাদিসে পড়েছিলাম, ধ্বংস তার জন্য যার আজকের দিনটি গতকাল থেকে উত্তম হলো না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে-রাতে অনেকবার তাওবাহ করতেন এবং তাওবাহ করার শিক্ষা আমাদের জন্য রেখে গেছেন। এই তাওবাহ আমাদের জন্য একটি আশাবাদী পদক্ষেপ। ভুল আর অপরাধের অতীতকে ফেলে শুভ্র-সুন্দর আত্মা নিয়ে নতুন করে শুরু করার শিক্ষার মতন লাগে আমার কাছে। আমি হয়ত ঠিক এখনই তাওবাহ করছি আমার অতীত ভুলের জন্য। আল্লাহ আমার নিয়্যাহ দেখে তাওবাহ কবুল করে হয়ত সুন্দর জীবন দান করবেন, আখিরাত হয়ত এরই ফলশ্রুতিতে মুক্তি পাওয়ার আনন্দে উদযাপিত হবে। তাই কখনই ভেঙ্গে না গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে তাওবাহ করে দোয়া করে নতুন করে জেগে ওঠার প্রচেষ্টা করা একটা দারুণ ব্যাপার হতে পারে একটা জীবনের জন্য, একটা মানুষের জন্য, একটা রুহের জন্য। প্রতিদিন অনেকবার, সাপ্তাহিকভাবে জুমু’আর দিনে… হয়ত বছরে একবার আরো বড়ো করে।

নতুন বছর শুরু হবার উপলক্ষ্যে আমিও নতুন করে কিছু শিখবার নিয়াত করেছি — ক’টি সূরা শিখবো, তাফসীর শুনবো এবং পড়বো। কেননা কুরআনের চাইতে অসাধারণ আকর্ষণীয় বই যে হতে পারেনা — এই উপলব্ধিটা আমার একদম নতুনরূপে নতুন অনুধাবন। ইদানিং স্বপ্নমাখা চোখে এই বইটার দিকে তাকিয়ে অনুভব করি আমাদের আল্লাহ এই অপার সৌন্দর্য্যময় বইটিকে জীবনের গভীরতম জ্ঞানে পূর্ণ করে পাঠিয়েছেন আমাদের মাঝে, অথচ টেরই পাইনি সব সমস্যার সমাধান এখানেই! ভেবেছি এই নতুন বছরে সময় নষ্ট কম করবো, বেশিরভাগ সময় মাথাকে খাটানোর চেষ্টা করবো। কতটা কাজে লাগবে জানিনা, নেগেটিভ চিন্তার চাইতে বড় কথা, আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে থাকবো নিজেকে উন্নত করতে। এই ক্রমাগত চেষ্টা করা, কাজটায় লেগে থাকা হলো মুজাহাদা। মুসলমানদের একটি বৈশিষ্ট্য হবার কথা এই ক্রমাগত চেষ্টা করা। প্রতিদিন খুব অল্প করে হলেও নিজের উন্নতি হওয়াটাও জীবনের একটা প্রাপ্তি। অথচ আমরা কেয়ারফুল না থাকলে কেবল প্রতিদিন অধঃপতনই হতে থাকে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আসলে উচিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সাহায্য ক্রমাগত সাহায্য চাইতে থাকা। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করবেন।

এই বছরে আমার বিশেষ প্ল্যান হলো আমি আরবি শিখবো কুরআনের শব্দকে মূল ধরে। ত্রিশতম পারার শব্দার্থ সংবলিত একটা বই কিনেছি। সেখানে আলাদা আলদা সূরাতে শব্দগুলো অর্থ করে দেয়া আছে। সূরা পড়ার পর অর্থ পড়ার সময় শব্দগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিলে কাজে দিচ্ছে। এই সেন্স গ্রো করার পরে আরবি আরো ভালো করে শেখার নিয়্যাত করেছি। কিন্তু এই শব্দার্থ হলো সবচাইতে কম সময় দিয়ে কাজটাতে লেগে থাকার একটা প্ল্যান। ইদানিং সব স্কলারদের লেকচার শুনে একটা কথা ঘুরে ফিরে পাচ্ছি যে কুরআনের সবচাইতে সুন্দর এবং কেবলমাত্র সঠিক রিয়ালাইজেশন যদি তা আরবিতেই ফিল বোঝা যায় বা ফিল করা যায়। তাই ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই আরবি গ্রামার ধরে শেখার কাজ শুরু করবো যেন অন্তত কুরআনুল কারীমের কথাগুলো বুঝতে পারি। হতে পারে সেটা এই পৃথিবীতে আমার আসার আরেকটি বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষ্যে শুরু হবে। আরেকটা নতুন উদ্যমে পথচলা!

আল্লাহ আমাদের সবার জীবনকে তার রাহমাত দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিন। আল্লাহর ভালোবাসা যেন আমাদের আচ্ছন্ন রাখে, আমরা যেন তার শোকর গুজার মু’মিন বান্দা হতে পারি। আমিন।


* * * * * * * * * *
লেখক সম্পর্কে:

স্বপ্নচারী আব্দুল্লাহ পেশায় একজন প্রকৌশলী। পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি আত্মার বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞানার্জনে তার আগ্রহের কমতি নেই। স্বভাবগতভাবে অন্তর্মুখী হলেও শেখা ও লেখার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে আলোকিত ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে তিনি আগ্রহী।
# ব্যক্তিগত ব্লগ লিঙ্ক

No comments yet

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: