Skip to content

সভ্য না বর্বর? :: রেহনুমা বিনত আনিস

জুন 15, 2011

আমার ছোটভাই আহমদ মাঝে মাঝে খুব বিজ্ঞের মত কথা বলে। একবার আধুনিক শিক্ষিত লোকজনের পোশাকের অভাব নিয়ে হা হুতাশ করছিলাম, সে সান্তনা দিয়ে বলল, ‘আপু, দুঃখ কোরোনা, পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর মানুষ পোশাকের অভাবে ভোগে- একেবারে বর্বর আর অতিরিক্ত সভ্য!’ আমার ভাইটির বিশ্লেষণের যথার্থতা যাচাই করে হতবাক হয়ে গেলাম। আসলেই তো! বর্বর জাতির লোকেরা হয়ত ঝোপজঙ্গলে বসবাস করে- শিক্ষা নেই, সচেতনতা নেই, তাই লজ্জাও নেই। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ তো জ্ঞানের সাগরে মুক্তো আহরণ করার কথা, তাইনা? জ্ঞানই তো হবে তাদের অলংকার! শিক্ষার মূল্য কোথায় থাকে যদি শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হারিয়ে যায়? যদি মানুষ সভ্য হয়ে আবার আদিম স্বভাবে ফিরে যাওয়াই সাব্যস্ত করে তাহলে তাতে কি তার মেধার প্রকাশ ঘটে? নাকি শরীরের? তবে কি আমাদের শিক্ষাই ত্রুটিপূর্ণ?

আজ লালবৃত্তের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে কথাটা আবার মনে পড়ে গেল। লালবৃত্ত বলছিলেন, ‘আপু, ভেবে দেখেন, সমাজে অতি দরিদ্র এবং অতি ধনবান শ্রেণীর লোকেদের মাঝে আসলে খুব একটা তফাত নেই- এরা উভয়েই অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে; উভয়েই অন্যের সম্পদ হস্তগত করে, কোন ধরণের বাজে কাজ করতে কাউকে পরোয়া করেনা; উভয়েই অন্যের স্ত্রীর প্রতি হাত বাড়ায় এবং নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনা…’ আমি জোগালাম, ‘উভয়ই নিয়মনীতিহীন, উচ্ছৃংখল’। তাহলে প্রশ্ন আসে, মানুষের সম্পদ কি কাজে লাগে? ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দারিদ্র যাকে পথভ্রষ্ট করে তাকে বোঝার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু যার সব থেকেও কিছু থাকেনা, তাকে কি দিয়ে সমবেদনা জানানো যায়? সম্পদ থেকে লাভ কি যদি তা তাকে একজন উন্নত মানুষে রূপান্তরিত করতে না পারে?

আমার ছাত্রী মাইমুনা দুঃখ করে লিখেছে, একজন মডেল জানে এখানে তাকে দেখিয়ে বস্তু বিকানো হচ্ছে- এখানে সে গৌণ আর বস্তু মূখ্য। তবু কেন মেয়েরা ঝাঁকে ঝাঁকে ব্লেড, জুতা, সাবান বা সিমেন্ট বিকানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে এমন এক অনিশ্চিত জগতে যেখানে পথ হারাবার ভয় ক্ষণে ক্ষণে? আহারে! যে মিডিয়া তাদের পণ্য বানায় সেই মিডিয়ার কল্যাণেই আজ আমাদের বোনেরা এবং তাদের বাবামা সবাই জানে সেই ঝকঝকে হাসি আর তকতকে মেকাপের পেছনের জগতটা কত পংকিল। এখানে হাজার জনের মধ্যে হয়ত একজন শেষপর্যন্ত পৌঁছতে পারে সেই স্বর্ণশিখরে যার স্বপ্ন দেখে তারা এই জগতে প্রবেশ করে, ততদিনে নিঃশেষ হয়ে যার তার অনেক সম্পদ। তবে কোন মোহে তারা একটি স্বল্পমেয়াদী সাফল্যের পেছনে ছোটে যার জন্য ত্যাগ করতে হয় অনেক কিন্তু তার তুলনায় পাওয়া যায় অল্পই? মাইমুনা লিখেছে, আজ আশি বছর বয়সেও লতা মঙ্গেশকরের গান শোনার জন্য লোকে ভীড় জমায়। কিন্তু এমন একজন মডেলের নাম বলুন তো যার আশি বছর বয়সে লোকে তাকে দেখার জন্য ভীড় করবে? পার্থক্যটা সবাই বোঝে। মেধার বিকাশ ঘটালে অনন্তকাল বেঁচে থাকা যায়। শরীরের বিকাশ মৃত্যুর আগেই সমাপ্তি ডেকে আনে। কিন্তু চোখ কান সব থাকা সত্ত্বেও মানুষ এগুলো বন্ধ করে চলতেই ভালোবাসে। এতে চিন্তা করে কাজ করার ঝামেলা থেকে সে বেঁচে যায়? কিন্তু আসলেই সে বাঁচে কি?

অনার্স জীবনে রেহানা ম্যাডাম প্রায়ই বলতেন, ‘আকলমান্দকে লিয়ে ইশারা কাফি’। আমি ভাবতাম তারপরও কুর’আনে এতবার শাস্তির কথা বলার, এমনকি সুরা তাওবার মত একখানা ভয়ানক থ্রেট দেয়ার কি দরকার ছিল? একসময় বুঝলাম, এই কুর’আন কেবল জ্ঞানী মানুষের জন্য পাঠানো হয়নি, বরং সার্বজনীন পাঠকশ্রেণীর জন্য একে ডিজাইন করা হয়েছে। এখানে বুঝদার পাঠকদের জন্য যেমন আনন্দদায়ক এবং চিন্তা উদ্রেককারী কথাবার্তা রয়েছে, তেমনি চোর ছ্যাঁচড় বাটপাড় শ্রেণীর লোকদের জন্য রয়েছে ভয়ানক সব বিপদসংকেত। চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী। সুতরাং, তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে পথে আনা সম্ভব নয়। বরং জবাবদিহিতার ভয় তাকে পথে আনতে না পারলেও বিপথ হতে রক্ষা করতে পারে অনেকখানি। তাতে তার কতটুকু উপকার হোল না হোল সেটা সে বুঝবে, কিন্তু ভেবে দেখুন তো- নিরীহ গোবেচারা শ্রেণীর লোকজন, যারা আত্মরক্ষার খাতিরেও একটা কটু কথা বলতে পারেনা- তাদের কতখানি সহায়তা হয়!

বান্ধবী মিতুল আপা বলছিলেন, মানুষের নীচতায় হতবাক হয়ে যান। সান্তনা দিলাম, ‘আপা, হতবাক হবেন না, মানুষ নীচতায় শয়তানকেও হার মানায় কারণ আল্লাহ তাকে শয়তানের চাইতে বেশী বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন’। আসলে মানুষকে শয়তান বা ফেরেস্তা কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। সে পরিচালিত হয় নিজের ইচ্ছেয়। বেচারা শয়তান বড়জোর তাকে পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তটা পরিপূর্ণভাবে তার নিজের, কাজটাও তাকে কষ্ট করে নিজে নিজেই করতে হয়। এর জন্য সে নিজের কাছে নিজে যুক্তি খাড়া করে কাজটা আসলে কত মহৎ, এর পেছনে উদ্দেশ্যটা আসলে কত ভালো- দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের নায়কের মত। সে সুদখোর বুড়িকে হত্যা করার আগে নিজেকে বোঝায়- বুড়ির তো কেউ নেই, কেউ তাকে মিস করবেনা, বয়স্কা মহিলা এত টাকাপয়সা দিয়ে কি করবে? তদুপরি মহিলা একজন সুদখোর, তাকে সরিয়ে দিলে মানুষের উপকার হবে। সে একজন সম্ভাবনাময় তরুণ, তার যদি টাকাপয়সা থাকে তাহলে সে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। এই যুক্তির আশ্রয়ে সে বুড়িকে হত্যাও করে। কিন্তু বিবেকের দংশন তাকে শেষপর্যন্ত ফলভোগ করতে দেয়নি, সে নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সমস্যা হোল, কাউকে গালি দিলে তাকে সরি বলা যায়। কাউকে মেরে ফেললে তাকে কবর থেকে তুলে জীবিত করা যায় কি? সুতরাং, পাপের প্রায়িশ্চিত্ত করার কোন উপায় থাকেনা।

এ’তো গেল যার বিবেক আছে বা কোন এক সুপ্রভাতে জেগে ওঠে তার কথা। কিন্তু যার বিবেকের কলকব্জায় সমস্যা আছে, তাকে কি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলুন তো? তার জন্য আসলে নৈতিক শিক্ষা এবং জবাবদিহিতার ভয় এ’ দু’টোর কোন বিকল্প নেই। মানুষ মানুষকে ফাঁকি দিতে পারে কিন্তু তাকে কি করে ফাঁকি দেবে যে তার মনের গোপন কথাটি পর্যন্ত টের পেয়ে যায়? তাকে কি করে এড়াবে যে তাকে সর্বত্র সর্বাবস্থায় দেখতে পায়? ফেসবুকের কর্মকর্তারা আমাদের কথাবার্তা, মনোভাব, পছন্দ অপছন্দ সব পর্যবেক্ষণ করে জেনে আমরা অজানা আশংকায় কুঁকড়ে যাই। অথচ কেউ এর চেয়েও বেশী জানে বিশ্বাস করলে কি কোন আজাবাজে কাজের চিন্তা আমাদের স্পর্শ করতে পারত? এই একটি চিন্তাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারত সমস্ত ধ্বংসাত্মক চিন্তাভাবনা এবং কাজ থেকে- নিজের প্রতি এবং অপরের প্রতি।

এভাবে চিন্তা করলে আমাদের শিক্ষা আমাদের আইনস্টাইন বা নিউটন বানাত, আমাদের বিত্ত আমাদের হাতেম তাঈ বা হাজী মোহসিন হতে উদ্বুদ্ধ করত, আমাদের মেয়েরা জোন অফ আর্ক বা মাদার টেরেসা হবার স্বপ্ন দেখত, আমরা ভালো কাজ করতে পারি বা না পারি অন্যায় কাজের চিন্তাও করতাম না।

আমাদের সমাজে আজ যে অন্ধকার চারিদিক থেকে ধেয়ে আসছে, আমরা পথ খুঁজে পাচ্ছিনা তা থেকে সহজেই উত্তরণ করা যেত জ্ঞানের আলো জ্বেলে। মায়েরা তাদের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তাদের সংসার এবং সন্তানদের সময় দিতেন, পাশ্চাত্যের অনুকরণে নিজেদের ভাসিয়ে দিতেন না অজানার পথের ভেলায়। স্বামীরা স্ত্রীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতেন, সংসারের দায়িত্ব পালনের প্রতি যত্নশীল হতেন, সন্তানদের সময় দিতেন যেন স্ত্রী কিছুটা সময় পায় নিজের উন্নয়নের জন্য। উভয়ে মিলে সন্তানদের জন্য সৃষ্টি করতে পারতেন সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর সাহচর্যের এক অনন্য বাগান যেখানে প্রস্ফুটিত হতে পারত তাদের পুষ্পসম সন্তান। বাবামা একটা নতুন টিভি বা সাইকেল কেনার জন্য একটি মেয়েকে পাঠাতেন না দূর বিদেশে যেখানে সে অসহায় এবং অরক্ষিত। ছেলেরা মেয়েদের বিয়ে করতনা একজন ভালো স্ত্রী ব্যাতীত আর কিছু পাবার আশায়। ছেলেদের বাপমা বিয়ে করতে বাঁধা দিতনা ঘরে টাকাপয়সা আসা বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে। সন্তানেরা বাপমাকে অবহেলা করে নিজেদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে মজে থাকতে পারতনা, ‘আমাদের বাপ মা তো সারাদিন পার্টি করে কাটিয়েছে, স্ফুর্তি করেছে, ওদের প্রতি আমাদের কেন দায়িত্ব পালন করতে হবে?’ বলে। আমার বোনটি, আপনার মেয়েটি পথে যেকোন একজন পুরুষকে দেখে নিজের ভাইয়ের মতই নিরাপদ মনে করত। আমার ছেলেটি, আপনার ভাইটি মনে করত এই দেশ আমার, এই সমাজ আমার, একে সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও আমার। এমন একটি সমাজ কি আমরা চাইনা?

পথ কিন্তু চোখের সামনেই, পা বাড়ানোর অপেক্ষা …

Advertisements
No comments yet

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: