Skip to content

বন্ধু, তুমি? তুমিও?

এপ্রিল 26, 2011

লিখেছেনঃ শরীফ আবু হায়াত

১.

রাত প্রায় এগারটা। মুঠোফোন ধরতেই উৎকন্ঠ গলা – “ বাবা, শিবলি কি তোমার সাথে আছে?” আমি ইতস্ততভাবে বললাম – জ্বী আঙ্কেল।
“ওকে ফোনে পাচ্ছি না যে।”
– ব্যাটারির চার্জ শেষ তো তাই।
“ এত রাত হলো, এখনো বাসায় আসছেনা কেন?”
– জ্বী এখনই রওনা দিচ্ছে।

২.

রাত প্রায় বারোটা। আম্মা অসুস্থ, হাসপাতালে নিতে হবে। ছোট ভাইটা থাকে সোহরোয়ার্দি মেডিকেলের হোস্টেলে। ফোনের পর ফোন দিয়ে যাচ্ছি একটা এম্বুলেন্স আনার জন্য। পাচ্ছিনা। অগত্যা ফোন করলাম ওর বন্ধুকে।

হ্যালো, রাসেল?
– জ্বী ভাইয়া বলেন।
আচ্ছা ঐশী কই?
– কিছুক্ষণ আগেও তো সাব্বিরের সাথে পড়ছিল। দাড়ান ভাইয়া আমি দেখে আসি কই গেল।

৩.

মকবুল হোসেন রাসেলকে ফোনে পাচ্ছেননা কাল সন্ধ্যা থেকে। একবার ফোন করছেন সাব্বিরকে আরেকবার জয়কে। জয় রাসেলের কলেজ জীবনের বন্ধু। রাজশাহী মেডিকেলের ছাত্র – হবু ডাক্তার। সাব্বিরও তাই। সোনার টুকরো ছেলে সব – বিপদে-আপদে ছেলের সাথী ওরা।

৪.

রাসেল আইপিএলে বাজি ধরে ৩ লাখ টাকা জিতেছিল সাব্বিরের কাছ থেকে। জয় রাসেলের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল দেড় লাখ টাকা, ১৫ শতাংশ সুদে। রাসেল দুই হবু ডাক্তারের কাছে টাকা ফেরত চাচ্ছিল বেশ কয়েকদিন ধরে। রাত প্রায় বারোটা। তিন বন্ধু মিলে খেল তিনটি ফেন্সিডিল। রাসেলেরটায় ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল। অজ্ঞান রাসেলের শরীরে বিষ ইঞ্জেকশন দিয়ে ঢুকিয়ে দিল ওরা। আধমরা দেহ মাটিতে পুঁতে তার উপর কচু গাছ লাগিয়ে দিল।

৫.

পত্রিকায় খবরটা পরার পর থেকে আমার ‘কমন সেন্স’ কাজ করা বন্ধ করে দিলো। ‘রাসেল’ আর ‘সাব্বির’ নামদুটো আমার ছোটভাইয়ের মেডিকেলের দু’জন বন্ধুর বলে নয়। অসংখ্যবার বন্ধুদের বাবা-মাদের কাছ থেকে সন্তান-অবস্থান-নির্ণয় ফোনের নস্টালজিয়ার জন্যেও নয়। বন্ধুত্ব ব্যাপারটা কোথায় নেমে গেছে সেটা চিন্তা করতেই আমার সাধারণ বোধ তার কাজ বন্ধ করে দিল। বন্ধুত্বের ব্যাপারে আমি কিছুটা খ্যাপাটে। আমার বন্ধুদের জন্য আমি কি করতে পারি এটা যারা আমার বন্ধু শুধু তারাই জানে। এখন আমার কাছের বন্ধুদের সবাই দূর পরবাসে থাকে, তাদের জন্য আমার মনের প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হয় তা লিখে বোঝানো যাবেনা। যাদের বন্ধুত্ববোধ খুব তীব্র তারা হয়ত কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবেন। কোন বন্ধু তার বন্ধুর জন্য জীবন না দিয়ে, তার জীবনটা নিয়ে নেবে এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনা। তাও কলেজ জীবনের বন্ধু!

সাব্বির আর জয় মিলে রাসেলকে মেরে ফেলার ঘটনাটা পড়ার পর থেকে আমার মাথায় তিনটা গান ঘুরেছে – অমিতাভ বচ্চনের ‘ইয়ে দোস্তি, হাম নেহি ছোড়েঙ্গে’, মান্না দের ‘কফিহাউস’, শানের ‘তানহা দিল’ [আমি এখন গান শুনিনা, শোনাটাকে ঠিকও মনে
করিনা কিন্তু বহু বছরের অভ্যাস মনের কানে প্রায়ই ঢেউ তোলে] – গত বিশ বছর ধরে আমাদের দেশের সংষ্কৃতির যে সুবাতাস বইছে, তাতে আমি নিশ্চিত যে এই তিনটা গান জয় আর সাব্বিরও শুনেছে। হয়ত কফিহাউসকে বাঙালীর সর্বকালের সবচেয়ে প্রিয় গানের তালিকায় চতুর্থ স্থানে আনতে তারা বিবিসির জরিপে ভোটও দিয়েছে। কিন্তু এই গানগুলো আমাদের যে মেসেজটি দেয়ার কথা ছিল সেটা আমরা পেলামনা কেন? তবে কি সংগীত-শিল্প-কলা শাস্ত্র আমাদের সুকুমারবৃত্তির উন্নতি না ঘটিয়ে প্রবৃত্তির পাশবিকীকরণ ঘটাচ্ছে? দু’জন হবু ডাক্তার সাত বছরের বন্ধু থেকে কেন জল্লাদ বনে গেল তার আসল কারণটা নিয়ে মানসিক ডাক্তার গবেষণা করতে পারে, সমাজবিজ্ঞানীরাও তত্ত্ব দিতে পারে। আমি তাত্ত্বিক নই, তাই আমার কাছে যা দায়ী মনে হয়েছে সেটা অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। যদি সত্যিকার অর্থে পরমতসহিষ্ণুতা থাকে তবে বাকিটুকু পড়তে পারেন, সেকুলার সচল মুক্তমনাদের পাঠ-পরবর্তী বিবাদে আমি যারপরনাই ত্যক্ত।

৬.

মদ-জুয়া-লটারি এসবকে অপবিত্র শয়তানের কাজ বলে ক্বুর’আনে বর্ণিত হয়েছে। এর মাধ্যমে শয়তান মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে বলে আল্লাহ সাবধান করে দিয়েছেন। আইপিএল যা ভারতীয় পুঁজিবাদীদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরী করা হয়েছে তা দিয়ে বাংলাদেশের তরুণেরা যখন বাজী ধরে তখন আমরা ব্যক্তির দোষ দেখি, আইপিএলের সমস্যা খুঁজে পাইনা। পাশ্চাত্য নোংরামি উপমহাদেশে ইন্সটল করাটাকে আমরা আধুনিকতা ভাবছি। কালো টাকা জিইয়ে রাখতে আর সারা বছর বাজিকরদের রুজি-রুটির ব্যবস্থা করতে যে ডান্ডাবাজির আয়োজন করা হল তাকে আমরা ক্রিকেটের উন্নয়ন ভাবছি। আমাদের দেশের মানুষ বিদেশে নিলামে বিক্রি হয়েছে সেটাতে আমরা প্রচুর গর্বিত। কিন্তু কোনদিনকি আমরা ভেবে দেখেছি – খেলাধূলায় বিভিন্ন দলের সমর্থন আমাদের কি দিয়েছে? কেকেআর জিতলে আমার কি লাভ? চেন্নাই? পাঞ্জাব? লিভারপুল? বায়ার্ন ম্যুনিখ? রোনালদো সেরা না মেসি তাতে আমার কয়টাকা কামাই হবে? লারা না টেন্ডুলকার – কে সেরা সে বিচারে আমার কি এসে যায়? পরকালের কথা বাদ দেই, দুনিয়াতে কি ঘোড়ার ডিম লাভটা হয়?

কিন্তু ক্ষতি? আমার বন্ধুর সাথে আমার শত্রুতা হয়। আমার বন্ধুর দল জিতলে, তার আনন্দে আমি বেজার হই। তার পছন্দের দল হারায় যখন তার মন খারাপ তখন আমি তাকে খোঁচা মারি, কাটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটা দেই। অথচ কথা ছিল বন্ধুর দুঃখ-কষ্ট আমি ভাগাভাগি করে নেব, তার সুখে সুখী হব, দুখে দুখী!

সাত সাগর পারের ব্রাজিলকে নিয়ে আমি ঝগড়া করি! তাদের সাথে করি যাদের সাথে আমার প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়। যাদের নিয়ে করি তারা আমার নামটা জানে কি? আর্জেন্টিনা হেরে গেলে ট্রেনের তলায় মাথা দিলো কিশোর। মেসি-ম্যারাডোনার কানেও সে খবর পৌছলো কি? মুখ খুলে গালি-গালাজ করলাম, হাত খুলে পেটালাম (বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় দেশে অন্তত বিশটি সংঘর্ষের ঘটনা পেপারে এসেছে) কাদের জন্য? আমার ভাইকে মারলাম, বন্ধুকে মারলাম যেই নক্ষত্ররাজির জন্যে তাদের সাথে এই জীবনে সামনা সামনি দেখা হবে কি? দূরদর্শন আর পত্রিকার ছবি আপন হল, আর পাড়ার ছেলেটা হলো পর? বিবেকটাকে আজ আমরা এতটাই পঙ্গু বানিয়ে ফেলেছি?

বাজি হলো-শত্রুতা হলো-মকবুল হোসেনের বুক খালি হলো-আড়াই বছরের একটা বাচ্চা ছেলে এতিম হলো; কমলো না চিয়ারলিডারদের নাচ। ম্লান হলোনা শাহরুখের মুখের হাসি। গরীব দেশের ফকির সরকারের ভর্তুকির কাগজ ব্যয় হতে থাকলো আইপিএলের ছবি আর কেচ্ছায়!

৭.

কফি হাউস আধুনিক বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের প্রাণের গান। কি নেই এতে? – আড্ডা আছে, নস্টালজিয়া আছে, বন্ধুত্ব আছে, ভালোবাসা আছে – মধ্যবিত্তের জীবনের সব উপকরণই আছে। সুপর্ণ কান্তি ঘোষের সুরটাও খুব সহজেই গলায় তুলে ফেলা যায়। কিন্তু এ গানে আরো একটা অমোঘ সত্যি লুকিয়ে আছে। সত্যিটা হলো – এটা সেই সমাজের গান যে সমাজে টাকাটাই সুখ মাপার স্কেল। নিখিলেশ-মৈদুল প্রবাসী, পেটের দায়েই হয়তোবা। মৃত ডিসুজা, পাগল রমা রায় আর মৃত্যুপথযাত্রী অমলদের ভীড়ে যে ছবিটা চোখে আটকে থাকে তা সুজাতার। ধনী স্বামী জুটিয়ে নেবার সুবাদে আজ সে সবচে সুখী। তার দেহে হীরে-মাণিক্যের গয়না। নিখিলেশ-মৈদুল-ডিসুজা-রমা-অমল সব হেরোদের ভীড়ে সুজাতা একা চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বাস করুন এ গান আমি এককালে হাজারবার শুনেছি- এখানে সম্পদের প্রতি শ্লেষ নেই, একটা সহজ-সরল বর্ণন আছে; রয়েছে ধ্রুবসত্যসুলভ স্বীকৃতি – যার টাকা বেশী সেই সবচে সুখী। আমরা জানিনা সুজাতার স্বামী তার সাথে রাত কাটায়, না সুন্দরী সেক্রেটারির সাথে। আমরা জানিনা সুজাতার ছেলে ইয়াবা খায় কি না। আমরা জানিনা সুজাতা যখন দ্বোতলায় পার্টিতে থাকে তখন তার মেয়েকে কেউ ধর্ষণ করে মেরে রেখে যায় কিনা। আমরা খালি জানি সুজাতার সব কিছু অনেক দামী – সে সবচাইতে সুখে আছে। আমরাও সেই সুখের খোঁজে উদ্বাহু ছুটেছি। আর এই সুখের মূল্য দিতে ঝরে যাচ্ছে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সততা আর মানুষের যতসব মনুষ্যত্ববোধ। অশেষ সুখের সন্ধানে নিঃশেষ হচ্ছি আমরা।

আমি বলছিনা গৌর কান্তি দে’র কফিহাউস গানের জন্য আমাদের সমাজের এ দশা। আমি বলছি এ গান এবং এর মত আরো হাজারটা যে মর্মবাণী আমাদের মরমে ঢুকিয়েছে তাই আমাদের সমাজের ক্ষয়িষ্ণুতার প্রধান কারণ। বস্তুবাদ সুখ দেয় না, কেড়ে নেয়।

৮.

সেকুলার মানে পার্থিব। সেকুলার চেতনা মানে পৃথিবীতে যেমনিভাবে হোক সুখে থাকতে হবে – তাতে আর লক্ষ মানুষ অসুখী হোক। এ ধর্মে সে সুদ, ঘুষ, গার্মেন্টসের শ্রমিকদের রক্ত – সবই হালাল। লাখো মানুষের সঞ্চয় শেয়ার বাজারে ফটকাবাজি করে পকেটে পোরা আইনসম্মত। এ ধর্মে যে দীক্ষা নিয়েছে তার কাছে দুনিয়াটা স্বর্গ। সে যা খুশি করতে পারে – বন্ধুকে মেরে পঁচিয়ে কঙ্কাল বিক্রি, ভাইকে কেটে কিডনি বেঁচা বা বাপকে মেরে সম্পত্তি ভাগ করে নেয়া কোনটাতেই তার অরুচি নেই। কারণ এ ধর্মে সাফল্য মানে পৃথিবীকে ভোগ করা আর ভোগ করতে চাই টাকা।

কিন্তু এ ধর্ম কতটা সত্যি? রাসেলের মরা লাশ আইপিএলের ছক্কায় উত্তেজিত হবেনা, ব্যাংকের সুদের হিসাব করবেনা, রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাসে গিটার বাজিয়ে কফি হাউসের আড্ডার গান গাইবেনা। সে যদি জানতো তিন লাখ টাকা না চাইলে সে জীবনে বেঁচে যাবে, সে কখনো এই টাকা চাইতোনা। জয় আর সাব্বির টাকা বাঁচালো কিন্তু নিজেদের জীবনটাকে উপভোগ করতে পারলো কি?

যারা পৃথিবীকে রাস্তা না মনে করে গন্তব্য মনে করছে তারা যদি জানতো আসল গন্তব্যে কি আছে তবে এই পৃথিবীকে তারা এভাবে চাইতোনা। যারা এই পৃথিবীতে বাঁচার জন্য বাঁচছে তাদেরকে পৃথিবী ছলনা করছে, পৃথিবীর ভিতরে ঢোকার সাথে সাথে সেই ভ্রান্তির ছলন কেটে যাবে, মানুষ আফসোস করবে – এই পৃথিবীর জন্য আমি এত কিছু করেছি? এই পৃথিবীর জন্য?

৯.

সবচেয়ে ভালো বন্ধুটিও মিথ্যা বলতে পারে, প্রতারণা করতে পারে। আল্লাহকে বন্ধু হিসেবে নিন, তিনি আপনাকে প্রতারণা করবেননা। আপনি সুখ চান তো পৃথিবীকে না বলতে শিখুন। পৃথিবীতে বাঁচুন, কিন্তু পৃথিবীর জন্যে বাঁচবেননা যেন।

আর পার্থিব এ জীবন তো খেল-তামাশা ও আমোদ-প্রমোদের ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে পরকালের আরামই হবে তাদের জন্য মঙ্গলময় যারা ধ্বংস থেকে বেঁচে থাকতে চায়। তোমরা কি তবে চিন্তা-ভাবনা করবেনা? [আল আনআম – ৩২]


* * * * * * *
লেখক সম্পর্কে:

শরীফ আবু হায়াত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজির ছাত্র ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। তার লেখা প্রথম বইয়ের নাম – ‘ইসলামঃ তত্ত্ব ছেড়ে জীবনে’।

ব্যক্তিগত ব্লগ লিঙ্ক

Advertisements
One Comment leave one →
  1. van_Anzah permalink
    জুলাই 6, 2011 5:01 অপরাহ্ন

    ”পৃথিবীতে বাঁচুন, কিন্তু পৃথিবীর জন্যে বাঁচবেননা যেন।” – sums it up

আপনার মন্তব্য রেখে যান এখানে, জানিয়ে যান আপনার চিন্তা আর অনুভুতি

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: